গ্রন্থমেলায় প্রাণের উৎসব

সঙ্কুচিত হয়ে আসছে সৃজনশীল প্রকাশনা

Printed Edition
Back------2
বাংলা একাডেমিতে একুশে বইমেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় :নয়া দিগন্ত

আবুল কালাম

দেশে প্রকাশনা শিল্পে সৃজনশীল বইয়ের বাজার সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। একুশে বইমেলায় প্রতি বছরই হাজার হাজার বই প্রকাশ হলেও শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যমূলক বইয়ের পেশাদার লেখক ও প্রকাশক তৈরি হচ্ছে না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বইমেলায়। এতে প্রকাশিত বইয়ের মান নিয়ে মেলায় আগত পাঠকের মধ্যে বিরূপ সমালোচনা বাড়ছে। যার কারণে দেশের প্রকাশনা শিল্প ও সৃজনশীল প্রকাশনা বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।

সৃজনশীল প্রকাশকরা বলছেন, বইমেলাকে তারা জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবেই দেখেন। তবে নানা কারণে এ শিল্পকে এখন আর্থিকভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। কাগজ ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক স্টল ভাড়া ও অব্যবস্থাপনা, পাইরেটেড বইয়ে বাজার দখল, মানসম্পন্ন বইয়ের অভাব, রমজান বা অসময়ে মেলা, মানহীন বইয়ের আধিক্য, এসব কারণে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বইমেলায়। যার কারণে সৃজনশীল বই কমে যাওয়ায় বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ কমছে। এতে দিন দিন টিকে থাকার লড়াইয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছে সৃজনশীল প্রকাশনা।

বইমেলায় আগত পাঠকরা বলছেন, ভাষাশহীদদের স্মৃতির সাথে জড়িত একুশে বইমেলা মানুষের প্রাণের মেলা হয়ে উঠলেও এর প্রসারে সংশ্লিষ্টদের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। মেলায় প্রতি বছর তিন-চার হাজার নতুন বই প্রকাশিত হচ্ছে। লেখকের সংখ্যাও বেড়েছে। পাঠকের ভিড় বাড়ছে। এক মেলাতেই কোটি টাকার ঊর্ধ্বে বই বিক্রি হচ্ছে; কিন্তু তাতে বইজগতের কোনো উন্নয়ন হচ্ছে না এটা পরিষ্কার।

একজন প্রকাশক নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করলেও সৃজনশীল প্রকাশনায় প্রত্যাশিত পেশাদারিত্ব ও নির্ভরযোগ্য নীতি-পদ্ধতিও গড়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে না। তার কারণ পেশাদার লেখকের অভাব। অন্য দিকে পেশাদার লেখক কিংবা লেখকের সৃষ্ট বিশেষ কোনো গ্রন্থপণ্যের বাজার সৃষ্টির ব্যাপারে বড় বড় প্রকাশকও পেশাদারি ভূমিকায় নেই।’

তিনি বলেন, ‘এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে সৃজনশীল প্রকাশনা। কারণ লেখক, প্রকাশক ও পাঠক মিলে সৃজনশীল এ মাধ্যমের উন্নয়ন ও বিকাশে বাংলা একাডেমি, সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি থাকার পরও শুধু বইমেলার মধ্যেই এর কার্যক্রম অনেকটা সীমাবদ্ধ। জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি ভাষা-সাহিত্যের গবেষণা ও উন্নয়নমূলক সব কাজ ছাপিয়ে শুধু একুশের বইমেলার আয়োজক হয়ে উঠেছে। যার কারণে প্রতি বছর প্রধানমন্ত্রী মেলা উদ্বোধন করে গ্রন্থোন্নয়নের নানা দিকনির্দেশনা দিলেও তা কোনো কাজে আসছে না।

এ বিষয়ে বাংলা একাডেমির একজন কর্মকর্তা জানান, তারা সবসময় প্রকাশনা জগতের উন্নয়নে কাজ করছেন। তবে কিছু কিছু কাজে সমন্বয়ের অভাব থাকায় সেগুলো বাস্তবায়নে জটিলতা হচ্ছে। বইয়ের মান ও সৃজনশীল প্রকাশনার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা প্রকাশকদের বিষয়। তারা যখন কারো বই ছাপবেন তার বিষয়বস্তুসহ সবকিছু মিলিয়ে তা মানসম্পন্ন করার দায়িত্ব একান্তই তাদের। এ জন্য বাংলা একাডেমি দায়ী নয়।

বাংলাদেশ সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গফুর হোসেন এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির (বাপুস) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির পরিচালক আবুল বাশার ফিরোজ শেখ বলেছেন, রমজানে বইমেলা আয়োজন মানেই প্রকাশকদের জন্য প্রায় নিশ্চিত লোকসান। তার ভাষ্য, তারা বইমেলাকে জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবেই দেখেন। তবে নানান কারণে পুরো এ শিল্পকে আর্থিকভাবে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। একের পর এক লোকসানি বইমেলা, পাঠকসংখ্যার উল্লেখযোগ্য হ্রাস এবং কাগজ ও মুদ্রণ ব্যয়ের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। এসব সম্মিলিত চাপের কারণে ইতোমধ্যে বহু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। যারা টিকে আছে, তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ অবস্থায় সৃজনশীল প্রকাশনার উন্নয়ন কিভাবে সম্ভব।

মেলায় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক নূরে আলম সিদ্দিকীর ‘আমার গেছে যে দিন’। এর প্রকাশক জ্ঞানকোষ প্রকাশনী।

এই বইয়ে স্মৃতিচারণামূলক লেখার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে নূরে আলম সিদ্দিকীর ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে শেষজীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলিÑ ঘাটের দশক থেকে রাজনীতি, ছয় দফা আন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ।

পিনাকী ভট্টাচার্য-এর বইয়ের বাংলা অনুবাদ ‘ফুলকুমারী’। এই বইটির অনুবাদ করেছেন হাসান রোবায়েত। বইটিতে করোনা মহামারীর (কোভিড-১৯) সময়ে প্যারিসে একজন শরণার্থীর নিঃসঙ্গ জীবন এবং সেই একাকীত্বের মধ্যে একটি ইঁদুরের সাথে তার বন্ধুত্বের করুণ ও বাস্তবধর্মী চিত্র ফুটে উঠেছে। এটির ইংরেজি সংস্করণ অ্যামাজনের ‘ইন্ডিয়া হিস্ট্রি’ এবং ‘হিস্টরিক্যাল ইন্ডিয়া অ্যান্ড সাউথ এশিয়া বায়োগ্রাফি’ ক্যাটাগরিতে বেস্ট সেলার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। বাংলাদেশে বইটি প্রকাশ করেছে প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য। বইটির গায়ের দাম ৬০০ টাকা হলেও বর্তমানে বিভিন্ন অনলাইন বুকশপে এটি ছাড়ে পাওয়া যাচ্ছে।

লেখক ড. সুলতান মাহমুদ-এর মার্ক কোকেলবার্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রাজনৈতিক দর্শন। এর প্রকাশক অবসর। গণতন্ত্র ও এআই নিয়ে আলোচনা এই বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। প্রত্যেকটি অধ্যায়ে দেখানো হয়েছে যে, এআই কিভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়গুলোর ওপর প্রভাব ফেলে এবং কেন এআই নিজেই রাজনৈতিক।

মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ : ব্যক্তিগত নোট ১৯৭১-১৯৭৩। লেখক তাজউদ্দীন আহমদ-সাজ্জাদ শরিফ (সম্পাদক)। প্রকাশক প্রথমা। তাজউদ্দীন আহমদের এই ব্যক্তিগত নোট মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ নামে নবীন রাষ্ট্রের সূচনাকালকে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করে তুলেছে।

গতকাল মেলা শুরু হয় বেলা ২টায় এবং চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জন্মশতবর্ষ : সুকান্ত ভট্টাচার্য’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুমন সাজ্জাদ। আলোচনায় অংশ নেন আহমেদ মাওলা। সভাপতিত্ব করেন আবদুল হাই শিকদার। বিকেল ৪টায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেলা ১১টা থেকে মেলা চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশু প্রহর।