খামেনির পর ইরান : সামনে কোন পথ?
নেতৃত্বের বিদায়ে রাষ্ট্র কি ভেঙে পড়বে?
জিওপলিটিক্যাল ইনসাইটসের বিশ্লেষণ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
তেহরানের আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ। লক্ষ্যবস্তু- ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব।
সেই হামলায় নিহত হন আলী খামেনি, প্রায় চার দশক ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। যৌথ ইসরাইল-মার্কিন এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন নেতার মৃত্যু নয় বরং অর্ধশতাব্দী ধরে কেন্দ্রীভূত ধর্মীয়-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর এক গভীর আঘাত।
প্রশ্ন এখন একটাই- ইরানের ভবিষ্যৎ কী? শাসক বদলাবে নাকি রাষ্ট্র ভেঙে পড়বে নাকি আরো কঠোর হবে ক্ষমতার কেন্দ্র?
ইতিহাস বলছে- একজন নেতার পতন মানেই কোনো ব্যবস্থার পতন নয়। আর কোনো ব্যবস্থার পতন মানেই গণতন্ত্র নয়।
‘ডিক্যাপিটেশন’ কৌশলের সীমাবদ্ধতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে বর্ণনা করেছেন “নির্ণায়ক আঘাত” হিসেবে ইরানের সামরিক শক্তি ভেঙে দেয়া, পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো এবং জনগণের জন্য স্বাধীনতার পথ খোলা। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বাস্তবতা ভিন্ন।
একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে তিন স্তম্ভের ওপর- বলপ্রয়োগ বা নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ; প্রশাসনিক সক্ষমতা; রাজনৈতিক বৈধতা।
বিমান হামলা প্রথমটিকে দুর্বল করতে পারে। কিন্তু বাকি দুটো তৈরি করতে পারে না।
ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া- সবখানেই একই শিক্ষা : ক্ষমতা ভাঙা সহজ, শৃঙ্খলা গড়া কঠিন।
টিকে গেলে কী হবে?
যদি বর্তমান ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে বরং দুর্বল অবস্থায় টিকে যায়- তাহলে সংস্কার নয় বরং আরো কঠোরতা আসার সম্ভাবনাই বেশি। গবেষণা বলছে, বাইরের চাপে থাকা শাসনব্যবস্থা সাধারণত- জাতীয়তাবাদ উসকে দেয়; জরুরি আইন জারি করে; বিরোধীদের দেশদ্রোহী বলে দমন করে; নজরদারি বাড়ায়।
ইরানের ইতিহাসও তাই দেখায়।
১৯৮০-এর দশকে অভ্যন্তরীণ সঙ্কটে ব্যাপক দমন-পীড়ন। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে গুলি, গ্রেফতার, কারাবন্দী। বিশেষ করে যদি আইআরজিসি অক্ষত থাকে, তবে ক্ষমতা আরো বেশি নিরাপত্তা সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত হবে। ফলাফল হতে পারে- ছোট কিন্তু আরো কঠোর এক রাষ্ট্র।
এখানে এক ধরনের বিদ্রƒপ আছে : বাহ্যিক হস্তক্ষেপ কখনো কখনো স্বৈরতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করে।
ভেঙে পড়লে কি ভালো হবে?
অনেকে মনে করতে পারেন- শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে স্বাধীনতা আসবে। বাস্তবতা এত সহজ নয়।
রাষ্ট্র টিকে থাকে শুধু নেতৃত্বে নয় বরং কর আদায়; বিদ্যুৎ-পানি-স্বাস্থ্যসেবা; অবকাঠামো; আইনশৃঙ্খলা- এই প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে গেলে শুরু হয় বিশৃঙ্খলা।
ইরানে ঝুঁকি আরো বেশি। কারণ আইআরজিসি শুধু সেনাবাহিনী নয়- এটি বড় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও পৃষ্ঠপোষকতার কেন্দ্র।
নেতৃত্ব হারালে মাঝারি পর্যায়ের কমান্ডাররা অঞ্চল ও সম্পদের দখল নিতে পারে। তখন দেখা দেয়- মিলিশিয়া; গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব; আঞ্চলিক শক্তির হস্তক্ষেপ।
২০০৩-পরবর্তী ইরানের অভিজ্ঞতা সতর্কবার্তা- কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভাঙলে টুকরো টুকরো সহিংসতা জন্ম নেয়।
আর লিবিয়া দেখিয়েছে- প্রতিষ্ঠান ভেঙে গেলে শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
তিনটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ :
১. টিকে থাকা ও কঠোরতা বৃদ্ধি : রাষ্ট্র নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আরো কেন্দ্রীভূত হবে। নজরদারি বাড়বে, বিরোধিতা কমবে, নাগরিক স্বাধীনতা সঙ্কুচিত হবে।
২. খণ্ডিত পতন : ক্ষমতার শূন্যতায় মিলিশিয়া ও গোষ্ঠী সংঘর্ষ। অর্থনীতি ভেঙে পড়া, বিদেশী হস্তক্ষেপ, দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা।
৩. নিয়ন্ত্রিত রূপান্তর (সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু আশাব্যঞ্জক) : প্রশাসনিক কাঠামো টিকে থাকবে। ধাপে ধাপে সংস্কার। আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর।
নাগরিক সমাজ ও প্রবাসী নেটওয়ার্কের অংশগ্রহণ। ইতিহাস বলছে- এই পথ বিরল, কিন্তু টেকসই।
আসল পার্থক্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- রেজিম পরিবর্তন একটি ঘটনা। রাষ্ট্র নির্মাণ একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
প্রথমটি বোমায় সম্ভব। দ্বিতীয়টি সম্ভব হয় কেবল বৈধতা, প্রতিষ্ঠান ও সময়ের মাধ্যমে। মিসাইল নেতা সরাতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস, স্থিতি ও শাসনক্ষমতা তৈরি করতে পারে না।
তাহলে ইরানের ভবিষ্যৎ কী?
গভীরভাবে অনিশ্চিত। এখন সবকিছু নির্ভর করছে- নিরাপত্তা বাহিনীর ঐক্য; নাগরিক সমাজের সংগঠনক্ষমতা; অর্থনীতির সহনশীলতা; আঞ্চলিক শক্তির হস্তক্ষেপ; আর কূটনৈতিক সমন্বয়ে।
ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না শুধু কে ক্ষমতা হারালেন তা দিয়ে। বরং নির্ধারিত হবে- কোন প্রতিষ্ঠানগুলো ধাক্কা সত্ত্বেও টিকে থাকে।
ইতিহাসের শেষ শিক্ষা সহজ : ক্ষমতা ধ্বংস করা সহজ। শৃঙ্খলা পুনর্গঠন করা কঠিন। একজন নেতার মৃত্যু একটি ঘটনা। কিন্তু একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের জন্ম- একটি দীর্ঘ পরীক্ষা।
আর সেই পরীক্ষাই এখন শুরু হলো ইরানের জন্য।