এএফবির গোলটেবিল বৈঠক

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি

Printed Edition
3rd-3
জাতীয় প্রেস ক্লাবে এগ্রিকালচারিষ্টস ফোরাম আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি গোলটেবিল আলোচনা সভায়। আলোচকরা আসন্ন বাজেটে টেকসই কৃষির উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের আধুনিকায়নে বরাদ্দ বৃদ্ধির জোর দাবি জানান। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা মোকাবেলা এবং প্রান্তিক খামারিদের প্রণোদনা দেয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে অ্যাগ্রিকালচারিস্টস ্ ফোরাম অব বাংলাদেশের উদ্যোগে এই সভার আয়োজন করা হয়, যেখানে দেশের বিশিষ্ট কৃষিবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নেন।

প্রধান অতিথি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মোল্লা, এমপি বর্তমান জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে জানুয়ারি থেকে অর্থবছর শুরুর প্রস্তাব দেন, উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ১০-১২ শতাংশ প্রথম ছয়-সাত মাসে ব্যয় হয় এবং বছরের শেষভাগে তড়িঘড়ি ভাউচারের মাধ্যমে ৪০-৫০ শতাংশ ব্যয় করার প্রবণতা কাজের মান নষ্ট করে বলে তিনি মন্তব্য করেন। কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারজনিত আর্সেনিক সমস্যা সমাধানে তিনি উপরিভাগের পানি ব্যবহার ও শিল্পে বাধ্যতামূলক ইটিপি স্থাপনের ওপর জোর দেন।

একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম জানান, এ বছর সামগ্রিক বাজেট প্রায় ১৯ শতাংশ বাড়লেও কৃষি বাজেট বেড়েছে মাত্র ১.২ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় প্রকৃতপক্ষে হ্রাস। গত দেড় দশকে মোট বাজেট প্রায় পৌনে ছয় গুণ বাড়লেও কৃষি বাজেটের অংশ ক্রমাগত কমেছে; ২০১১-১২ সালে যা ছিল ১০.৬৫ শতাংশ, গত বছর তা ৬ শতাংশে এবং এবার নেমেছে ৫ শতাংশে। কৃষি ঋণের প্রবৃদ্ধি গত ১৫ বছরে বার্ষিক ৮ শতাংশ হারে বেড়ে এখন প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছলেও, এটি মোট ঋণের মাত্র ২ শতাংশ এবং কৃষকদের মাত্র ২২ শতাংশ এর আওতায় আসে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগও অপ্রতুল, চীন-ভিয়েতনামের মতো দেশ কৃষি জিডিপির ৩-৫ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় করলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ০.৪ শতাংশ।

কৃষিবিদ ড. শহিদুল্লাহ শরীফ জানান, প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ০.২৯ শতাংশ, যা ১৮-২০ কোটি মানুষের প্রোটিন চাহিদা মেটাতে অত্যন্ত অপ্রতুল বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি পোলট্রি খাতের বর্তমান সঙ্কট তুলে ধরে বলেন, উৎপাদন খরচ প্রায় ২১০ টাকা হলেও বাজারে মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৮০ টাকায়, ফলে খামারিরা প্রতি কেজিতে লোকসান গুনছেন।

ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির তার বক্তব্যে বলেন, এই বাজেট ধোকাবাজির বাজেট। সংসদে এখনো কাউকে দেখলাম না এই কথা তুলতে যে, জমির আইল তুলে দিতে হবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে জমির বেচাকেনা ও সমবায় ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা ইমপ্লিমেন্ট করতে হবে। সিএস খতিয়ান অনুযায়ী দেশে ৩৩০০ নদী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে নদীর অভাব রয়েছে, যা কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে । নওগাঁর অটোমেটিক রাইস মিলগুলোর ৯৫% লোকই ঋণখেলাপি এবং এটি একটি রুগ্ণ শিল্প। পুরো চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র দুই-তিনজন ব্যক্তি, যারা ১৮ কোটি লোকের ভাগ্য নির্ধারণ করছে। ধান উৎপাদন বাড়লেও বিপণন ও সংরক্ষণের সঠিক ব্যবস্থা নেই । নওগাঁয় অনেক আম ও কাঁঠাল হয়, কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে তা নষ্ট হচ্ছে বা গরুকে খাওয়াতে হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, দেশকে রক্ষা করতে হলে কৃষিকে রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশে ভারী শিল্পের চেয়ে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। বর্তমান বাজেটে কৃষিখাতে যে বরাদ্দ বা বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে, তা পর্যাপ্ত নয় এবং পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি বা অন্যান্য কারণে ২০ টাকার জিনিস ঢাকায় আসতে ২০০ টাকা হয়ে যাচ্ছে। ড. শরিফুল আলম বলেন, সরকার খাদ্যনিরাপত্তার চেয়ে তামাক চাষকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং তিন ফসলি জমিতেও তামাক চাষের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। তিনি জানান, দেশের ছয়টি সার কারখানার মধ্যে মাত্র একটি সচল এবং চাহিদার তুলনায় উৎপাদন প্রায় অর্ধেক। তিনি আরো জানান, দেশ গম, চিনি, সয়াবিন ও পাম অয়েলের জন্য প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল, অথচ দেশীয় তেলবীজ চাষে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এএফবি মহাসচিব কৃষিবিদ শেখ মুহাম্মদ মাসুদ। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ড. এটিএম মাহবুব ই ইলাহী। সঞ্চালনায় ছিলেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মো: মিজানুর রহমান। প্যানেল আলোচক হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর ড. ফিরোজ মাহমুদ, সাবেক সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ সফিউল্লাহ, সাবেক সচিব নূরুল আলম কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি আহসানউজ্জামান লিন্টু, প্রফেসর ড. জাহাঙ্গীর কবির সরকার, ড. ফজলুল হক এবং সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ব্রি) ড. মোশাররফ হোসেন।