কায়রো বিমানবন্দরে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন হয়রানি
Printed Edition
এলামী মো: কাউসার কায়রো, মিসর
মিসরের কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঢাকা অভিমুখী বাংলাদেশী যাত্রীদের, বিশেষ করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও পর্যটকদের নজিরবিহীন হয়রানি ও অপমানের শিকার হতে হচ্ছে। গত ৩০ জুন এবং ১ জুলাই কায়রো বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২ এ সৌদি এয়ারলাইন্সসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্লাইটের যাত্রীদের সাথে এই ঘটনা ঘটে। মূলত কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও চোরাচালান চক্রের কারণে পুরো বাংলাদেশী কমিউনিটি এখন কায়রো এয়ারপোর্টে চরম কড়াকড়ি ও সন্দেহের মুখে পড়েছে।
৩-৪ ঘণ্টা আটকে রাখা হয় শিক্ষার্থীদের
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গত ১ জুলাই বেলা ১২টা ৪০ মিনিটের একটি ফ্লাইটের প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশী শিক্ষার্থীকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশির বাইরে তিন থেকে চার ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। শুরুতে বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট দেখেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা লাগেজ চেকিং করতে অনীহা প্রকাশ করেন এবং “যা নিয়ে এসেছ, আগে তা রেখে এসো” বলে সাফ জানিয়ে দেন।
একেকজন শিক্ষার্থীকে দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত সমস্ত মালামালসহ কোনো প্রকার চেক করা ছাড়াই বের করে দেয়া হয়। পরে বারবার অনুরোধ ও আবেদনের পর সবার শেষে ৭ নম্বর গেট দিয়ে বাংলাদেশী যাত্রীদের একসাথে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়। ততক্ষণে সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনীয় মালামাল বিমানবন্দরেই ফেলে যেতে বাধ্য হন। ৪৬ কেজি মালামাল নেয়ার অনুমতি থাকলেও অনেকেই বাধ্য হয়ে মাত্র ৭-৮ কেজির হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে কোনোমতে বোর্ডিং করতে পেরেছেন।
নেপথ্যে ‘ফ্রেশ মালামাল’ ও কসমেটিকস চোরাচালান
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে “ফ্রেশ মালামাল, ১০০% রিস্কমুক্ত” ইত্যাদি চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী শিক্ষার্থীদের লাগেজ বা যাত্রী-সুবিধা অপব্যবহার করছে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে একেকটি লাগেজে ১০০ থেকে ২৮০ পিস পর্যন্ত শ্যাম্পু, সাবান, নিভিয়া ক্রিম, স্প্রে বা অবৈধ ওষুধ বহন করা হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কসমেটিকস বৈধ হলেও, পুরো লাগেজ ভর্তি করে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মালামাল নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। বিমানবন্দরে এই জালিয়াতি ধরা পড়ার কারণেই ক্ষুব্ধ মিসরীয় প্রশাসন এখন ঢালাওভাবে সব বাংলাদেশীদের তল্লাশি ও হয়রানি করছে।
এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ব্যবসায়ীরা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। কারণ মালামাল এয়ারপোর্ট পার না হলে তারা আমাদের কোনো টাকা দেয় না। তাদের কোনো রিস্ক নেই। অথচ আমরা সাধারণ ছাত্ররা সম্পূর্ণ লাগেজহীনভাবে, অপমানিত হয়ে দেশে ফিরছি। কায়রোতে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের যে সম্মান ছিল, তা এই চক্রের জন্য নষ্ট হচ্ছে।”
প্রবাসীদের উদ্বেগ ও দূতাবাসের হস্তক্ষেপের দাবি
দীর্ঘদিন ধরে মিসরে বসবাসরত প্রবীণ প্রবাসীরা জানিয়েছেন, বিমানবন্দরে বাংলাদেশীদের সাথে বর্তমান আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অপমানকর। চোরাকারবারি এবং হুন্ডি ব্যবসায়ীদের এই লাগামহীন কর্মকাণ্ডের কারণে কায়রো তথা মিসরের যেকোনো বিমানবন্দরে সাধারণ প্রবাসী শ্রমিক ও পর্যটকরা প্রতিনিয়ত অপদস্থ হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে মিসরে বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থান ও বসবাসের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়বে।
এই সঙ্কট নিরসনে এবং বিমানবন্দরে বাংলাদেশীদের হয়রানি বন্ধ করতে কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও বাংলাদেশ সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে মিসরীয় কর্তৃপক্ষের সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করার দাবি জানিয়েছেন বৈধ প্রবাসী, শিক্ষার্থী এবং শ্রমিকেরা। একই সাথে চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ না হয়ে দেশের সম্মান রক্ষার্থে সকল যাত্রীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।