পতনের বাজারেও অস্বাভাবিক দাম বাড়ছে দুর্বল কোম্পানির

শেয়ারবাজারে অস্তিত্ব হারাচ্ছে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দুই সপ্তাহ ভালো কাটিয়ে আবার ধারাবাহিক পতনের মধ্যে রয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। ফেলে আসা সপ্তাহটিতে (৩০ নভেম্বর-৪ ডিসেম্বর) মোট পাঁচটি কার্যদিবসের চারটিতেই বড় ধরনের পতনের শিকার ছিল পুঁজিবাজারগুলো। টানা এই পতনে দেশের দুই পুঁজিবাজারই বড় ধরনের মূলধন হারায়। এ পতনের ভালো ভালো কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে দরপতনের শিকার হলেও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে বাজারের সবচেয়ে দুর্বল কোম্পানিগুলোর কয়েকটির, যা বাজারের স্বাভাবিক আচরণের সাথে যায় না। এর মধ্যে মাত্র এক সপ্তাহে একটি কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে ৬০ শতাংশেরও বেশি।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, আমাদের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় সমস্যা কিছু অসাধু বিনিয়োগকারী যারা নৈতিকতার ধার ধারেন না। শুধুমাত্র মুনাফা লুটে নেয়াই তাদের লক্ষ্য থাকে। তবে তারা মনে করেন, সব পুঁজিবাজারেই এ ধরনের কিছু মানুষ যুক্ত থাকে। কিন্তু আমাদের বাজারে এরাই আধিপত্য বিস্তার করে আছে। তাই সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারের লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে এগিয়ে থাকা কোম্পানিগুলোর দিকে তাকালে এটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাজারের ওপর এদের দৌরাত্ম্য কতটা। যেখানে টানা দরপতনের শিকার হচ্ছে তালিকাভুক্ত ভালো কোম্পানিগুলো, সেখানে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দর বাড়ছে এসব দুর্বল কোম্পানির। যত দিন এদেরকে থামানো যাবে না তত দিন যত চেষ্টাই করা হোক পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক আচরণ আশা করা যাবে না।

বিদায়ী সপ্তাহের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সপ্তাহটিতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ দশ কোম্পানির পাঁচটিই ‘জেড’ ক্যাটাগরির। এ ছাড়া চারটি ‘বি’ ক্যাটাগরির ও একটি ‘এ’ ক্যাটাগরির। এদের মধ্যে সপ্তাহের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি উৎপাদনকারী কোম্পানি ঝিলবাংলা সুগার মিলস। কোম্পানিটি বিগত অর্থবছরে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এমনকি ডিএসইর ওয়েবসাইটে কোম্পানিটি কবে লভ্যাংশ দিয়েছিল তার কোনো তথ্যও বের করা যায়নি। গত অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি লোকসান দিয়েছে ৭৮ দশমিক ৮৭ টানা। এ ছাড়া নতুন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির লোকসান গুনতে হয়েছে ২৭ দশমিক ৯১ টাকা। গত সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছে ৬০ দশমিক ৩২ শতাংশ। আগের সপ্তাহের দর ৮২ টাকা থেকে গত সপ্তাহ শেষে কোম্পানিটির শেয়ারদর পৌঁছে যায় ১৩২ টাকায়।

গত সপ্তাহে ঢাকা শেয়ারবাজারে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় কোম্পানি ছিল যথাক্রমে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হওয়া বিডি থাই ফুডস ও বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম। দু’টি কোম্পানিই একই ব্যবসায়ী গ্রুপের। গত সপ্তাহে কোম্পানি দু’টির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৩৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ ও ২৪ দশমিক ০৪ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড সিরামিকস ১৭ দশমিক ৬৬, কাট্টলি টেক্সটাইল ১৭ দশমিক ৩১ ও খুলনা প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং-এর ১৩ দশমিক ৪১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। সপ্তাহের পুরোটা সময়জুড়ে তালিকায় থাকা প্রথম তিনটি কোম্পানিই ঘুরে ফিরে ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে স্থানটি ধরে রাখে।

গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স’র অবনতি ঘটে ১৪১ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট। রোববার ৫ হাজার ২৮ দশমিক ১৪ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে নেমে আসে ৪ হাজার ৮৮৬ দশমিক ৫৭ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৪২ দশমিক ৯৮ ও ৩২ দশমিক ০৬ পয়েন্ট।

সূচকের মতো অবনতি ঘটেছে বাজারটির লেনদেনেরও। গত সপ্তাহে ডিএসই মোট ২ হাজার ৫৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ২১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে বাজারটির লেনদেন ছিল ২ হাজার ৬২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। একই কাছে হ্রাস পেয়েছে ডিএসইর গড় লেনদেনও। গত সপ্তাহে ডিএসইর গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৪১১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে গড় লেনদেন ছিল ৫২৫ কোটি ১১ লাখ টাকা।

সূচকের বড় অবনতি বাজারটির মূলধনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ সময় ৭ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা মূলধন হারায় ডিএসই। ৬ লাখ ৯২ হাজার ২১৩ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে সপ্তাহ শুরু করা বাজারটির মূলধন সপ্তাহান্তে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৭৬২ কোটি টাকায়।

এ দিকে মূলধন ও অন্যান্য সঙ্কটে থাকা পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংকের মতো অস্থিত্ব হারাতে বসেছে দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও। পাঁচটি ব্যাংক নিয়ে সরকার একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছলেও এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেই। ফলস্বরূপ তালিকাভুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর দিন দিন শূন্য হতে চলেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নেতিবাচক ঘোষণা দিলেও শেয়ারহোল্ডারদের বিষয়ে কোনো ঘোষণা নেই। তাই প্রতিদিনই আর্থিক খাতের এ কোম্পানিগুলো দরপতনের শীর্ষে থাকছে। কোনো কোনোটির দর এখন এক টাকারও নিচে। হয়তো আর ক’দিন পর সবগুলো কোম্পানির দর শূন্য হয়ে যাবে। গত সপ্তাহে ডিএসইর দরপতনের শীর্ষে ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একটি ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। ৪০ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৩৯ শতাংশ দর হারিয়ে তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ফারইস্ট ফিন্যান্স।

অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স ৩৮ শতাংশ, পিপলস লিজিং ৩৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, এফএএস ফিন্যান্স ৩৫ দশমিক ৭১ শতাংশ , বিআইএফসি ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, জিএসপি ফিন্যান্স ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ ও প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ২৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ দরপতনের শিকার হয়।

কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্তত চারটি কোম্পানির শেয়ার এ মুহূর্তে ১ টাকার নিচে বেচাকেনা হচ্ছে। দুই টাকার নিচে লেনদেন হচ্ছে ৩টি কোম্পানি। এভাবে চলতে থাকলে খুব দ্রুতই এসব কোম্পানির শেয়ারদর শূন্যে চলে আসবে। তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে কিছু করা না গেলে এ খাতেও প্রচুর বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি হারাচ্ছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই।