পুরো সচল হতে আরো ১০ দিন লাগতে পারে
এক্সিলারেটের বিকল টার্মিনাল হতে এলএনজি সরবরাহ আংশিক চালু
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম
মহেশখালির মাতারবাড়িতে অগ্নিদুর্ঘটনায় অচল হয়ে পড়া মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল হতে আংশিক গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। বুধবার দিবাগত মধ্যরাতে পাইপে গ্যাস সরবরাহ চালু হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হওয়ার বিষয়টি সময় সাপেক্ষ বলেও সূত্র জানিয়েছে। এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় রফতানিমুখী গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল শিল্প বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পেট্রোবাংলার একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, অগ্নিদুর্ঘটনার শিকার টার্মিনালটিতে গত ৩০ জুলাই থেকে ত্রুটি সারাতে কাজ শুরু করে যুক্তরাজ্য ও আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দল। বিশেষজ্ঞ দলটি শুরুতে অক্ষত বয়লারটি চালু করার জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছিল এবং বুধবার দিবাগত রাতে এক্সিলারেট টার্মিনালের অক্ষত বয়লারটি চালু হয়। বয়লারটি চালু হওয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে মধ্যরাত ৩টা থেকেই গ্যাস সরবরাহ আংশিক চালু হয়েছে। বর্তমানে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি সরবরাহ হলেও ধাপে ধাপে তা ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি পর্যন্ত যাবে বলেও সূত্র জানায়। টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হতে আরো সময় লাগবে জানিয়ে সূত্র বলছে, বৈদ্যুতিক ক্যাবল প্রতিস্থাপন সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তা ছাড়া পুড়ে যাওয়া ক্যাবলসহ যন্ত্রাংশগুলো আমদানি করে আনতে হয়েছে।
পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, এ ধরনের এক্সপেরিয়েন্স একেবারেই নতুন। অক্ষত বয়লারটি চালু করে আংশিক সচল করার একটি উদ্যোগ শুরুতেই নেয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতেও এত সময় লেগেছে। তিনি জানান, টার্মিনালটি সচল হতে আরো কমপক্ষে ১০ দিন লেগে যেতে পারে।
লাইনে চাপ সঙ্কট : ভুগছে রফতানিমুখী শিল্প
এ দিকে চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোটাই এলএনজিনির্ভর হওয়াতে চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টরে এই সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করে। গ্যাস সঙ্কটের কারণে চট্টগ্রামে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রাষ্ট্রায়াত্ত সারকারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে, পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প কারখানায়ও উৎপাদন কমছে। বিশেষ করে রফতানিমুখী গার্মেন্ট ও ডায়িং কারখানাগুলো বেশ ভুগছে। রান্নার চুলায়ও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। সিএনজিচালিত যানবাহনগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সীমিত পরিমাণ গ্যাস নিয়ে পাম্প থেকে ফিরতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী- চট্টগ্রামে ৪শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে বুধবার মাত্র ১৯৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার তা বেড়ে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে। সূত্র বলছে সারা দেশে তিন হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান হওয়ার কথা থাকলেও গত বুধবার দুই হাজার ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান মিলে। এর মধ্যে আবার এলএনজির একটি টার্মিনাল থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের পাশাপাশি এক্সিলারেটের টার্মিনাল হতে আরো ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট জোগান বাড়ায় সারা দেশে মোট জোগান দুই হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো হবে। যদিও এলএনজির জোগান হওয়ার কথা ১১শ’ মিলিয়ন ঘনফুট।
এ দিকে গ্যাস সঙ্কটে বন্ধ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএল, রাউজান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দু’টি ইউনিট, শিকলবাহাসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ ছাড়া সারকারখানায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে বহুজাতিক কাফকোকে ৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত সিইউএফএল বন্ধ রাখা হয়েছে।
চাপ কম সিএনজি স্টেশনেও
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানাসহ সবগুলো খাত বেকায়দায় পড়েছে। সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় গতকাল বৃহস্পতিবারও সকাল থেকেই প্রতিটি রিফুয়েলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সিএনজি চালক হারুণ নয়া দিগন্তকে বলেন, ২ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ১০০ টাকার গ্যাস দিয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় রান্নাঘরের চুলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সঙ্কট তৈরি হয়েছে। ফলে সিএনজিনির্ভর গণপরিবহনগুলো বাড়তি ভাড়া আদায় করছে।
এলএনজি আমদানিসহ যাবতীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) চট্টগ্রামস্থ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, অগ্নিদুর্ঘটনার কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনালের সরবরাহ বন্ধ থাকলেও একটি বয়লার সচল হওয়ায় বুধবার দিবাগত মধ্যরাত ৩টা থেকে আংশিক সরবরাহ শুরু হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা নাগাদ টার্মিনালটি থেকে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে বলে তিনি জানান। কবে নাগাদ পুরোপুরি সচল হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। বিদেশী টিম এবং আমাদের টিম ত্রুটি সারাতে কাজ করছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে সুখবরের বিষয়ে আমরা আশা করছি।
প্রসঙ্গত: গত ২১ জুলাই মহেশখালিতে ভাসমান দু’টি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর এলএনজি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গ্যাস সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একটি ইউনিট চালু হওয়ায় সঙ্কট কিছুটা কমতে শুরু করলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে। কারণ টার্মিনালটি এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে আসেনি। পাশাপাশি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এলএনজি কার্গো খালাস ও সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব কার্যক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ আরো বাড়বে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক মেরামত শেষে টার্মিনালটি থেকে দৈনিক ২৮০ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, ধাপে ধাপে সেই সক্ষমতায় ফিরে এলে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট অনেকটাই প্রশমিত হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একক এলএনজি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।