সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশ ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক
ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন প্রধানের মন্তব্য
Printed Edition
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
‘সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশ ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক’ মন্তব্য করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেছেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রত্যক্ষ করার প্রত্যাশা করছে। গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ক্ষমতার জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের মতো অভিন্ন নীতির ভিত্তিতেই বাংলাদেশে আমাদের পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষককে দেশব্যাপী মোতায়েনের প্রাক্কালে গতকাল রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। পর্যবেক্ষকরা বাংলাদেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলায় নির্বাচনের দিনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। তারা ভোটকেন্দ্র খোলা, ভোটগ্রহণ, ভোটকেন্দ্র বন্ধ, ব্যালট গণনা এবং ফলাফল তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়ার ওপর সরেজমিন নজর রাখবেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষক দল পাঠিয়েছে ইইউ। গত ২৯ ডিসেম্বর ইইউর নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের ১১ জন বিশ্লেষকের সমন্বয়ে গঠিত কোর টিম ঢাকা পৌঁছায়। ১৭ জানুয়ারি ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকের কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে মিশনের তৎপরতা ৬৪ জেলায় সম্প্রসারিত হয়। নির্বাচনের ঠিক আগে গতকাল মঙ্গলবার ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষককে দেশের কৌশলগত স্থানে মোতায়েন করা হয়েছে। পূর্ণ সক্ষমতার এই মিশনে ইইউর ২৭টি দেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন প্রধান বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকরা এরইমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন এবং প্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন অংশীজনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এসব আলোচনার ভিত্তিতে সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী পরিবেশকে ইতিবাচক বলেই মনে হচ্ছে। নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও সামগ্রিক প্রত্যাশা ও পরিবেশ আশাব্যঞ্জক। অনেকেই এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও গণতন্ত্রের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন। আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। তখন এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে। নির্বাচন শেষে প্রায় দুই মাস পর প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ইভার্স ইজাবস বলেন, মিশনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বাহিনী, সেনাবাহিনী ও পুলিশের সাথে কথা বলা হয়েছে। কিছু এলাকা তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও আমাদের ধারণা সামগ্রিক পরিস্থিতি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
নির্বাচনে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনকে প্রকৃত অর্থে অংশগ্রহণমূলক করতে সব সম্প্রদায়, সংখ্যালঘু এবং বিশেষ করে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, পর্যবেক্ষকদের কাজ হলো নিরপেক্ষ থাকা এবং কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জড়িত না হওয়া। স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষকরা প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার শহর, নগর ও গ্রামে উপস্থিত থাকবেন। সারা দিনজুড়ে তাদের করা পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
ইভার্স ইজাবস বলেন, দেশজুড়ে আমাদের ২০০ জন পর্যবেক্ষক নিয়োজিত রয়েছেন, যার মাধ্যমে আমরা এই ঐতিহাসিক নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অবদান রাখছি। এই বৃহৎ এবং নিবেদিত মিশন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবিচল অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা থেকে প্রায় ৩৩০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে আসছেন। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ ছাড়াও কমনওয়েলথ থেকে ২৫ জন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস থেকে ২৮ জন, ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট থেকে ১২ জন এবং অন্যান্য সংস্থা থেকে ৩০ জন পর্যবেক্ষক স্বপ্রণোদিতভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে আসছেন।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আমন্ত্রিত প্রতিনিধিদের মধ্যে রয়েছেন ভুটান ও নাইজেরিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মালয়েশিয়ার নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিসের (আইসিএপিপি) স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান।
এ ছাড়া তুরস্ক থেকে ছয়জন সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম ইলেকশন কাউন্সিলের কর্মকর্তাসহ ১০ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও নাইজেরিয়া থেকে পাঁচজন করে প্রতিনিধিদল এবং ফিলিপ াইন, জর্জিয়া, রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, পাকিস্তান ও ইরানের নির্বাচন কমিশনের কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে আসছেন।
নির্বাচনের সংবাদ কভার করতে প্রায় ১৫০ জন বিদেশী সাংবাদিক বাংলাদেশে আসছেন। এর মধ্যে পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যম-প্রতিষ্ঠান থেকে ৪৮ জন, আলজাজিরা থেকে সাতজন সাংবাদিকসহ জাপানের সংবাদসংস্থা এনএইচকে, বিবিসি নিউজ, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স, এবিসি অস্ট্রেলিয়া ও ডয়েচে ভেলের প্রতিনিধি এবং স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা রয়েছেন।