হেমন্তের সৌন্দর্য হেমন্তের ফুল

Printed Edition

ড. আবদুল আলীম তালুকদার

প্রকৃতিজুড়ে এখন বিচরণ করছে ঋতুকন্যা হেমন্ত। বইছে শীতল হাওয়া, ভোরের সবুজ ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু চকচক করছে মুক্তোর মতো। ষড়ঋতুর মধ্যে হেমন্ত হলো চতুর্থ ঋতু। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের সমন্বয়ে গঠিত এই ঋতু। হেমন্ত মানেই সারি সারি পাকা ধান। হালকা সোনালি রোদের পরশ লেগে পাকা ধান চকচক করে। এমন অপরূপ শোভা দেখে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়। মানুষের মনকে বিমোহিত করে সোনালি প্রকৃতির রূপ। খুশির জোয়ার ভাসে কৃষকের ঘরে ঘরে। কিষাণ-কিষাণীর চোখে নতুন স্বপ্ন। আনন্দ আর খুশি বুকে নিয়ে নতুন ধানে গোলা ভরে। নতুন ধান ঘরে তুলে শুরু করে নবান্ন উৎসব। সবার ঘরে তৈরি হয় অনেক রকম পিঠাপুলি আর পায়েস। গ্রামীণ পরিবেশে ঢেঁকির শব্দ চারদিক থেকে শোনা যায়।

হেমন্তকালে বর্ষার পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর মাটি যেন ফিরে পায় নব যৌবন। খাল-বিল শুকিয়ে গেলে অনেক ধরনের সুস্বাদু মাছ পাওয়া যায়, যেমন- কই, টেংরা, পুঁটি, শিং, মাগুর, বোয়াল, টাকি, বাইমসহ নানা প্রকারের মাছ। এসব দেশীয় মাছ এই ঋতুতে অনেক বেশি পাওয়া যায়।

হেমন্ত ঋতু এলেই এক অপরূপ সৌন্দর্য গ্রামবাংলায় ফুটে ওঠে। সকালে হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে মাঠ, পাখিদের কিচিরমিচির কলরব, শিশিরভেজা অজস্র শিউলি ফুল গাছতলায় পড়ে থাকে, কোথাও কোথাও খেজুরগাছের সাথে বাঁধা রসের হাঁড়ি, হালকা রোদের পরশে সবুজ পাতা হেসে ওঠে।

এ সময় আকাশ মেঘমুক্ত থাকে। হালকা নীল রঙে সাজে বিকেলের আকাশ, মাঝেমধ্যে রঙধনুর দেখা মেলে। অতিথি পাখিদের আনাগোনা দেখা যায়। সুনসান নীরবতায় হেমন্তের স্নিগ্ধ বিকেলে মন প্রফুল্লতায় ভরে ওঠে। রাতের আকাশে ঝকঝকে জ্যোৎস্নার আলো কিষাণ-কিষাণীর মনে জাগিয়ে তোলে নতুন স্বপ্ন ও আশা। এই ঋতু শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে।

হেমন্তে অনেক ধরনের ফুল ফোটে, যেমন-

শিউলি

শিউলি ছোট বৃক্ষ বা গুল্ম। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nyctanthes arbor-tristis, এটি Oleaceae পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এ ফুলকে বলা হয় Night-flowering Jasmine। সংস্কৃত ভাষায় এ ফুল নালাকুমকুমাকা, হারসিঙ্গারাপুষ্পক, সুকলাঙ্গি, রাজানিহাসা, মালিকা, অপরাজিতা, বিজয়া ইত্যাদি নামে পরিচিত। সুগন্ধি এ ফুলে রয়েছে পাঁচ থেকে সাতটি সাদা বৃত্তি ও মাঝে লালচে-কমলা টিউবের ফুলগুলো রাতে ফোটে, সুগন্ধ ছড়ায় এবং সকালে ঝরে যায়। শরৎ ও হেমন্তকালের শিশিরভেজা সকালে ঝরে থাকা শিউলি অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য তৈরি করে।

হিমঝুরি

হিমঝুরির বৈজ্ঞানিক নাম Millingtonia hortensis, এটি Fabaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। এটি সুউচ্চ চিরসবুজ গাছ। এর আদিনিবাস মিয়ানমার। এ গাছের ডালপালা ছড়ানো-ছিটানো, আগা নিচের দিকে ন্যুয়ে থাকে। ডালের মাথায় অসংখ্য মঞ্জুরিতে বিক্ষিপ্তভাবে ফুল ফোটে। নলাকার সাদা ফুলের মাথায় পাঁচটি ছোট পাপড়ির একেকটি ফুল শুভ্র পাপড়ির মতো। আর নিচের দিকের ফুলগুলো ঝুলে থাকে। ফুল সরু, লম্বা। এর বীজ হালকা ও পাখাযুক্ত বলে বায়ুর মাধ্যমে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এর ইংরেজি নাম ‘ইন্ডিয়ান কর্ক ট্রি’। মাধুর্যে অপূর্ব হওয়া সত্ত্বেও গাছটি ঢাকায় বেশ দুষ্প্রাপ্য। হিমের দিনে সাদা হিমের মতোই যেন ফুলগুলো ঝরে পড়ে। হিমঝুরি রাতে ফোটে এবং গন্ধ বিলায়।

দুপুরমণি

হেমন্তের মৃদু শিশিরের ছোঁয়ায় বনে বনে ফুটে সিঁদুররাঙা এক বর্ণিল ফুল। তার নাম দুপুরমণি। দুপুরের মৃদু রোদে ফোটে বলেই কি এমন নাম! জানা নেই সে তথ্য! তবে সে বন্ধুলী, বন্ধুক, দুপুরচণ্ডী নামেও পরিচিত। দুপুরমণির বৈজ্ঞানিক নাম Pentapetes phoenicea। পরিবার মালভেসি। ইংরেজি নাম মিড-ডে ফ্লাওয়ার। দুপুরমণি খাড়া গুল্ম, প্রায় এক মিটার লম্বা হয়। শাখা-প্রশাখা ছড়ানো। পাতা একান্তার, দৈর্ঘ্য ছয় থেকে ১০ সেমি, খসখসে এবং কিনারা খাঁজকাটা। পাতা ও কাণ্ডের মিলিত অংশ থেকে কলি আসে। ফুল দুই সেমি। পাপড়ি পাঁচটি। দুপুরমণির আদি আবাস দক্ষিণ এশিয়া।

হাসনাহেনা

হাসনাহেনা একটি বাহারি কাষ্ঠল গুল্ম। হেমন্তে এ ফুল ফোটে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Cestrum nocturnum, এটি Solanaceae পরিবারের উদ্ভিদ। এর প্রচলিত নাম হাসনাহেনা, রাতের রানী। হিন্দি এবং উর্দুতে এ ফুলের নাম ‘রাত কি রানী’। হাসনাহেনার ইংরেজি নাম Queen of the night, Night blooming Jasmine। ফুল সরু, নলাকার, সরল, মসৃণ এবং একটু লম্বাকৃতির, দলমণ্ডল পাঁচ লোবযুক্ত। পাপড়ি সবুজাভ-সাদা হয়। ছোট ছোট অসংখ্য ফুল রাতেরবেলা চারদিক আমোদিত করে তোলে। রাতে ফুল থেকে কড়া, শক্তিশালী, মিষ্টি সুবাস বের হয়।

দেবকাঞ্চন

দেবকাঞ্চন মাঝারি আকারের গাছ। এটি আট থেকে ১০ মিটার উঁচু হয়। মাথা ছড়ানো। ফুল সুগন্ধি, সাদা বা বেগুনি। হেমন্তে সারা গাছজুড়ে ডাঁটায় ফুল ফোটে। পাপড়ি পাঁচটি, অসমান ও লম্বাটে, মুক্ত। শুঁটি শিমের মতো। চৈত্রমাসে নিষ্পত্র গাছে ঝুলন্ত ফলগুলো সশব্দে ফেটে বীজ ছড়ায়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Phanera purpurea, এটি Fabaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এর সাধারণ নামগুলো হচ্ছে Hong Kong orchid tree, purple bauhinia নামে পরিচিত। হিমালয়ের পাদদেশ ও আসাম দেবকাঞ্চনের আদি নিবাস। এর পাতা রক্তকাঞ্চনের চেয়ে আকারে একটু বড় গাছটিও। ফুল ছয় থেকে আট সেন্টিমিটার চওড়া, পাপড়ির সংখ্যা পাঁচটি। ফুলে মিষ্টি সৌরভ। সেই সৌরভে মুগ্ধ হয়ে কীটপতঙ্গ উড়ে আসে। তাতেই পরাগায়ন। দেবকাঞ্চন ফুল অসমান, লম্বাটে পাপড়ির মতো। এ সময় পাতাও থাকে অল্প। শীতের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফুল থাকে। কুয়াশার চাদর জড়ানো হেমন্তে শিশিরভেজা দেবকাঞ্চনের শোভা চোখজুড়ানো। কার্তিক মাসে দেবকাঞ্চন গাছে ফুল ফুটতে শুরু করে, পাতার ফাঁকে ডালগুলো ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। হালকা বেগুনি ছাড়াও এর পাপড়ি মৃদু রক্তিম, গোলাপি বা সাদাটে হতে পারে।

রাজ অশোক

রাজ অশোকের বৈজ্ঞানিক নাম Amherstia nobilis, এটি Fabaceae পরিবারের Caesalpiniaceaeউপগোত্রের উদ্ভিদ। এর স্থানীয় অন্যান্য নাম সোকরে, মিয়ানমার ফুল। রাজ অশোক মাঝারি আকৃতির বৃক্ষ, সাধারণত আট থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। রাজ অশোক বেশ দুর্লভ। গাছের উপরিভাগে কাণ্ড ও ডালপালা থেকে মঞ্জরিদণ্ড বের হয়। হাতখানেক লম্বা মঞ্জরিদণ্ডে বিপরীত সজ্জায় চার-পাঁচটি ফুল থাকে। পুষ্পদণ্ডের গোড়ার ফুলটি প্রথমে ফোটে, তারপর ক্রমেই পরের কলিগুলো ফোটে। প্রস্ফুটনকাল হেমন্ত থেকে শীত অবধি। বড় পাপড়িটির মাথার মাঝখানে সাদা ও লালে খুব সুন্দর করে চিত্রিত। কৃষ্ণচূড়ার একটি পাপড়িও অনেকটা এ রকম। এর আদিনিবাস মিয়ানমার।

লতা পারুল

লতা পারুল কাষ্ঠল লতানো গুল্ম। এর বৈজ্ঞানিক নাম Manosa alliacea, এটি Bignoniaceae পরিবারের উদ্ভিদ। এটি ইংরেজিতে এধৎষরপ ারহব এবং বাংলায় নীল পারুল নামে পরিচিত। পাতায় রসুনের মতো গন্ধ থাকে। ফুল হালকা বেগুনি, অনেক বড় বড় থোকায় ফোটে। দল ফানেলাকার, পাতা যৌগিক, পত্রক আয়তাকার, চার থেকে পাঁচ সেন্টিমিটার লম্বা, মসৃণ। শীর্ষের পত্রক প্রায়ই আকর্ষীতে পরিণত।

সোনাপাতি

সোনাপাতির বৈজ্ঞানিক নাম Tecoma gaudichaudi, এটি Bignoniaceae পরিবারের উদ্ভিদ। আরেক নাম গৌরিচৌরি। এটি চিরসবুজ ঝোপালো গাছ, চার মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। পাতা যৌগিক, আট থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, পত্রক দুই থেকে তিনটি। ফুল বড় বড় থোকায় ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে ওঠে। ফুল গ্রীষ্ম, বর্ষা ও হেমন্তকালে ফুটলেও প্রায় সারা বছর পাওয়া যায়। সোনাপাতির আরেকটি জনপ্রিয় প্রজাতি হচ্ছে Tecoma stans।

গন্ধরাজ

গন্ধরাজ আমাদের দেশে সব মানুষের কাছে অতিপরিচিত একটি ফুল। এ ফুল মিষ্টি ও তীব্র সুগন্ধের জন্য বেশ জনপ্রিয়। সুগন্ধে সেরা বলে এর নাম গন্ধরাজ। এর আদিনিবাস চীন। গন্ধরাজের বৈজ্ঞানিক নাম Gardenia jasminoides, এটি Gentianales বর্গের Rubiaceae পরিবারের বহুবর্ষজীবী একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। গুলচন্দ, বুঙ্গা চায়না, গার্ডেনিয়া প্রভৃতি নামেও পরিচিত। এ ফুলের ইংরেজি নামটি এসেছে বিখ্যাত আমেরিকান প্রকৃতিবিদ ড. আলেকজান্ডার গার্ডেনের নাম অনুসারে।

বকফুল

বকফুল গাছ ছোট, পাতাঝরা বৃক্ষ। বকপাখির মতো আকৃতি হওয়ায় হয়তো এর নামকরণ করা হয়েছে বকফুল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Sesbania grandiflora, এটি Fabaceae গোত্রের Papilionoideae উপগোত্রের উদ্ভিদ। ফুলের রঙ বকের মতো সাদা বলেই হয়তো এর নামকরণ করা হয়েছে বকফুল। এ দেশে তিন রঙের বকফুল দেখা যায়- সাদা, লাল, গোলাপি। লাল রঙের বকফুলের জাত এসেছে থাইল্যান্ড থেকে। এ জন্য একে থাই বকফুল বলা হয়। বকফুল সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। সাধারণত না ফোটা ফুল সবজি হিসেবে খাওয়া হয়।

ছাতিম

হেমন্তের দূত ছাতিম। ছাতিমের বৈজ্ঞানিক নাম Alstonia scholaris, এটি Apocynaceae পরিবারের বৃক্ষ। ইংরেজিতে গাছটি Devil's tree নামে পরিচিত। এ হেমন্তে ছাতিমের গন্ধে মুখরিত হয়ে থাকে চারপাশ। ছাতিমের ডালপালা ছড়ানোর বৈশিষ্ট্যটি অন্য গাছে নেই। এর সরল উন্নত কাণ্ড কিছু দূর উপরে হঠাৎ শাখা-প্রশাখার একটি ছাতার মতো পল্লব সৃষ্টি করে, আবার এক লাফে অনেক দূরে উঠে আবার একটি পাতার আবরণের ধাপ তৈরি করে। এর পত্র বিন্যাস আবর্ত। এক আবর্তে পাঁচ-সাতটি পাতা থাকে। পাতা বল্লমাকার। এর ফুল সবুজাভ সাদা বর্ণের, গন্ধযুক্ত ও গুচ্ছবদ্ধ। শরৎ থেকে হেমন্তে ফুল ফোটে। ফল ৩০ সে.মি লম্বা, কিছুটা বাঁকা, চ্যাপ্টা ও গাছে ঝুলে থাকে। ছাতিমের নাম সপ্তপর্ণী, সুপর্ণক, মদ্গন্ধ, সপ্তচ্ছদ ইত্যাদি। ছাতিমগাছের কাঠ নরম, তাই এর বাজার মূল্য কম। এ গাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে। ডালপাতা এমনভাবে সেজে ওঠে যেন তপ্ত দুপুরে পথিকের জন্য ছাতি মেলে দাঁড়িয়ে আছে কোনো স্বজন।

মল্লিকা

মল্লিকা ফুলের রঙ সাদা হয়। এই ফুলের গন্ধও খুব সুগন্ধি। মল্লিকা ফুল সাধারণত মাঠে, রাস্তার ধারে বা বাগানে জন্মায়।

এ ছাড়া হেমন্তের শুরুতে বরইগাছে ফুল এলে মৌমাছির গুনগুনানি শুরু হয়ে যায়। ভারী মিষ্টি ঘ্রাণ এই বরই ফুলের। এ সময় বরইগাছের ডালে টুনটুনি ও চড়ুইয়ের ওড়াউড়ির দৃশ্য প্রকৃতি-অন্তপ্রাণ মানুষকে স্মৃতিকাতর করে তোলে।

কামিনী

কামিনী ফুলের রঙ লাল, গোলাপি, বা সাদা হয়। এই ফুলের গন্ধও খুব সুগন্ধি। কামিনী ফুল সাধারণত গাছের ডালে ঝুলে থাকে।

হেমন্তে ফোটে কিছু অপ্রচলিত ফুলও। যেমন- বামনহাটি, বনওকরা ও দণ্ডকলস। এর মধ্যে বামনহাটি ফুল সাদা, ডালের আগায় প্রায় দেড় সেন্টিমিটারজুড়ে বিস্তৃত পরিসরে ফোটে। নতুন ফুল লালচে রেখাযুক্ত, নলাকার, সাধারণত আট থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা ও রোমহীন। বামনহাটি দেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, রংপুর ও টাঙ্গাইল জেলায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ফুল ফোটার মৌসুম জুলাই থেকে অক্টোবর।

অপরদিকে, বনওকরা বুনো গাছ। এটি রাস্তার ধারে, নদীর পাড়ে বা ঝোপঝাড়ে আগাছার মতো জন্মে। দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই এ গাছের দেখা মেলে। আর দণ্ডকলস বেশি দেখা যায় শর্ষেক্ষেতে। ফুলটিতে আছে মধু। উপরিউক্ত তিনটি গাছেরই রয়েছে অনন্য ভেষজগুণ।