জ্বালানি সঙ্কটে আমতলীর কৃষি রেডিও সম্প্রচার বন্ধ

বিপাকে উপকূলের লাখো মানুষ

Printed Edition
bangla-1
আমতলীতে কৃষি রেডিওর নতুন দ্বিতল ভবন : নয়া দিগন্ত

আমতলী (বরগুনা) সংবাদদাতা

জ্বালানি সঙ্কটের অজুহাতে বরগুনার আমতলীর জনপ্রিয় ‘কৃষি রেডিও ৯৮.৮ এফএম’-এর সম্প্রচার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১ এপ্রিল কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক মো: মশীহুর রহমানের স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তত পাঁচ লক্ষাধিক স্রোতার মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষক, জেলে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, যারা প্রতিদিনের কাজের জন্য এ রেডিওর দেয়া তথ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।

জানা গেছে, ২০১২ সালের ১ জানুয়ারি আমতলী উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে কৃষি রেডিওর কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে নানা প্রতিকূলতা থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই এটি কৃষক ও জেলেদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে এর কার্যক্রম সম্প্রসারণে সরকার জমি বরাদ্দ দেয় এবং ২০২৩ সালে নিজস্ব জায়গায় দ্বিতল ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়। বরগুনা ও পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার মানুষ এই রেডিওর সুবিধা পেয়ে আসছিলেন এতকাল যাবৎ।

কৃষি রেডিও থেকে নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কৃষি বিষয়ক পরামর্শ, দুর্যোগ সতর্কতা এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হতো। এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করে কৃষকরা জমিতে চাষাবাদ এবং জেলেরা নদী ও সাগরে মাছ ধরার সিদ্ধান্ত নিতেন। ফলে রেডিওটি তাদের জীবিকার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে ওঠে।

তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বরাদ্দ জটিলতা ও প্রশাসনিক অবহেলার কারণে কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দেয়। এর মধ্যেই ১ এপ্রিল হঠাৎ করে সম্পূর্ণ সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে কৃষিকাজ ও মৎস্য আহরণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সাথে সাধারণ মানুষ বিনোদন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

নাচনাপাড়া গ্রামের কৃষক কামাল মোল্লা বলেন, ‘কৃষি রেডিও ছিল প্রান্তিক মানুষের তথ্যের প্রধান ভরসা। আবহাওয়ার খবর জানার অন্য কোনো সহজ মাধ্যম আমাদের নেই। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা চরম শঙ্কা ও ভোগান্তির মধ্যে পড়তে যাচ্ছি।’

এই রেডিওর একজন শ্রোতা ময়নারানী বলেন, ‘রেডিওর অনুষ্ঠানগুলো নিয়মিত শুনতাম। এখন কয়েক দিন ধরে কিছুই পাচ্ছি না। রেডিওর সম্প্রচার দ্রুত চালু করা দরকার।’

কৃষক কামাল সিকদার জানান, কৃষি রেডিওর পরামর্শ অনুযায়ী তিনি বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন। এখন তথ্য না পেয়ে সমস্যায় পড়েছেন। একই কথা বলেন জেলে সাইদুল বয়াতি। তিনি বলেন, ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে সাগরে যেতাম। এখন আবহাওয়ার সংবাদ না জেনেই সম্পূর্ণ ঝুঁকি নিয়ে যেতে হচ্ছে।’

এ বিষয়ে আমতলী কৃষি রেডিওর স্টেশন ম্যানেজার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শেখ হাবিবুর রহমান বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। সঙ্কট সমাধান হলে আবার সম্প্রচার চালু হবে। আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী জানান, রেডিওটি দ্রুত চালুর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হবে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের উপপরিচালক ফেরদৌসী ইয়াসমিন বলেন, ‘অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে আপাতত কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বরাদ্দ পাওয়া গেলে পুনরায় সম্প্রচার শুরু করা হবে।’

এদিকে সংশ্লিষ্টদের আশ্বাস সত্ত্বেও উপকূলের মানুষ দ্রুত কৃষি রেডিও পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এটি শুধু একটি বিনোদন মাধ্যম নয়, বরং জীবন-জীবিকার সাথে জড়িত একটি অপরিহার্য সেবা।