সূচকের বড় পতন দিয়েই সপ্তাহ শেষ করল পুঁজিবাজার

অস্থিরতার পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচকের বড় অবনতি দিয়ে সপ্তাহ শুরু করা পুঁজিবাজারগুলো একইভাবে বড় পতনের মধ্য দিয়েই সপ্তাহ শেষ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারই বড় ধরনের সূচক হারায়। সকালে লেনদেনের শুরুতে কিছুক্ষণের জন্য ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও দিনের বাকি সময়ের পুরোটাই বিক্রয়চাপের মধ্য দিয়েই পার করে বাজারগুলো। সকাল সাড়ে ১০টার পর থেকে সূচক আর ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার সুযোগ পায়নি। দিনশেষে উভয় পুঁজিবাজারই বড় ধরনের সূচক হারায়।

সপ্তাহের প্রায় পুরোটাজুড়ে পুঁজিবাজারের নেতিবাচক প্রবণতার পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা পুঁজিবাজার। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আস্থাশীল হতে না পারলে পুঁজিবাজার স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে না। এই মুহূর্তে এ দুটোর কোনটিই দেশের সাধারণ মানুষের আশ^স্ত হওয়ার মতো অবস্থায় নেই। আর এ আস্থাহীনতাই প্রতিনিয়ত বাজারের পতন ঘটাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা তারা মনে করেন, এ মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের ধূম্র্রজাল চলছে। কেউই নিশ্চিত করতে পারছে না সরকারের ঘোষিত সময়ে আদৌ নির্বাচন হচ্ছে কিনা। তাছাড়া নির্বাচন না হলে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিধারা কোনোদিকে মোড় নিতে পারে, এসব প্রশ্নের কোনো সদত্তর কারো কাছেই নেই। তাই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে পুঁজিবাজারের মতো একটি সংবেদনশীল খাতের স্বাভাবিক আচরণ আশা করা যায় না। তাছাড়া পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় নিয়ামক ব্যাংকিং খাতের অচলাবস্থাতো আছেই। রাজনীতির পাশাপাশি অর্থনীতির এ দিকটিতেও আশ^স্ত হওয়ার মতো অবস্থা নেই। এ খাতে বিনিয়োগ করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশই তাদের পুঁজির সিংহভাগ হারিয়ে বসে আছেন। নিকট ভবিষ্যতে এ পুঁজি ফিরে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অথচ কেউই এর দায় নিচ্ছে না। তাহলে এ বাজারে আস্থা ফিরবে কিভাবে?

তাই এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারিদের ধৈর্য ধরা ছাড়া নিজেদের মূলধনকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার আর কোনো পথ নেই। সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় না ফেরা পর্যন্ত শেয়ার ধরে রাখার পরামর্শ দিলেন তারা।

এদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪০ দশমিক ৯২ পয়েন্ট অবনতি ঘটে। ৪ হাজার ৯২৭ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে ৪ হাজার ৮৮৬ দশমিক ৫৭ পয়েন্টে। সকালে লেনদেন শুরুর পর সীমিত সময়ের জন্য ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে। দিনের বাকি সময় চাপ সামলে আর ঊর্ধ্বমুখী হতে পারেনি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ৬ দশমিক ৬৭ ও ৯ দশমিক ৬১ পয়েন্ট।

অপরদিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১২৪ দশমিক ৪৫ পয়েন্ট হ্রাস পায়। ১৩ হাজার ৮৪০ দশমিক ১৫ পয়েন্ট থেকে যাত্রা করা সূচকটি গতকাল লেনদেনশেষে নেমে আসে ১৩ হাজার ৭৩৬ দশমিক ৮৩ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১১২ দশমিক ৭৪ ও ৭৬ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট।

সূচকের পাশাপাশি গতকাল ডিএসইর লেনদেনেও অবনতি ঘটে। বাজারটি গতকাল ৩৬৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৪১ কোটি টাকা কম। বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৪০৫ কোটি টাকা। চট্টগ্রামে আগের দিনের ১৩ কোটিতেই স্থির ছিল লেনদেন।

গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ। ২৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির এক কোটি ২০ লাখ আট হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকায় এক কোটি সাত লাখ ৪৭ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল খাদ্য খাতের কোম্পানি বিডি থাই ফুড। ডিএসসির লেনদেনের শীর্ষ দশে আরো ছিল যথাক্রমে শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি, ওরিয়ন ইনফিউশন, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, লাভেলো আইসক্রিম, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, একমি পেস্টিসাইডস ও ফাইন ফুডস।

গতকাল ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল মাত্র ৩৪টি কোম্পানি। এদের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল বিডি থাই ফুডস। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। তাছাড়া ৬ দমমিক ০৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটা টেক্সটাইল খাতের কাট্টলি টেক্সটাইল উঠে আসে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলোর মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ৫ দশমিক ৫৫, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ৫ দশমিক ০৮, চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৪ দশমিক ৬৭, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ৪ দশমিক ০৩, ফাইন ফুডস ২ দশমিক ৭৭, ইফাদ অটোমোবাইলস ২ দশমিক ৭২, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস ২ দশমিক ০১ ও স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্সের ১ দশমিক ৪১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৫টি কোম্পানির ও ফান্ডের মধ্যে দরপতনের শিকার ছিল ৩০৭টি। এদের মধ্যে দিনের দরপতনের শীর্ষে উঠে আসে প্রিমিয়ার লিজিং। কোম্পানিটির দরপতনের হার ছিল ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ। ১০ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল এফএএস ফিন্যান্স। এছাড়া অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট ৯ দশমিক ৬৯, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ, বিডি ওয়েল্ডিং ৯ দশমিক ২৪, ডিবিএইচ ফিন্যান্স ৯ দশমিক ০১, শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি ৮ দশমিক ৯১, রিজেন্ট টেক্সটাইলস ৭ দশমিক ৬৯ ফারইস্ট ফিন্যান্স ৭ দশমিক ৫৭ ও প্রাইম ফিন্যান্সের ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ দরপতন ঘটে।