বোশেখ মেলায় তুবা

Printed Edition
agdum-1
বোশেখ মেলায় তুবা

শফিকুল আলম টিটন

সারারাত ঘুম হয়নি তুবার। দুই চোখে নেই ছিটেফোঁটা ঘুমের প্রলেপ। স্বপ্ন আর ভাবনাগুলো বারবার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ওকে।

এই প্রথম বৈশাখী মেলায় যাবে তুবা। মায়ের মুখে শুনেছে উদ্যানের ভেতর নাকি পান্তা ইলিশের সারি সারি দোকান ঘর ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে একজন মোটাসোটা মচুয়া লোক মাটির খোরায় পান্তা ভাত আর এক টুকরো ইলিশ দিয়ে প্লেট সাজাচ্ছে। লবণ, মরিচ, পেঁয়াজ, তার সাথে আলুভর্তা, ঝাল শুঁটকি ভর্তা। এই হলো বৈশাখী পান্তা ইলিশ প্লেট। প্লেট প্রতি মূল্য ধরা হয়েছে ৫০০ টাকা। মচুয়া লোকটির পাশে উনুন ধরানো আছে। তাতে বড় একটি হাঁড়িতে ভাত রাঁধা হচ্ছে। গরম গরম। রান্না হয়ে গেলে বড় একটি ডেকচিতে ভাত ঢেলে তাতে পানি দিয়ে পরিপূর্ণ করা হচ্ছে। এটিকে বলে বোশেখের গরম গরম পান্তা ইলিশ।

সারারাত ঘুম হয়নি তুবার। ঠিক ধলপহরের সময় দুই চোখে নেমে আসে রাজ্যের ঘুম। ক্লান্তি নেমে আসে শরীরজুড়ে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে টেরই পায়নি ও।

ভিড় ঠেলে ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে মায়ের হাত ধরে। পেছন পেছন বাবাও এগিয়ে আসছে। মা বারবার সাবধান করে দিচ্ছে তুবাকে। মা দেখে দেখে পা ফেলো। পড়ে গেলে চোট পাবা।

আচ্ছা মা। সায় দেয় তুবা। এত্ত ভিড় কখনোই দেখেনি ও। প্রথম এলো মেলায়। সবার গায়ে বৈশাখী পাঞ্জাবি আর মেয়েরা বৈশাখী শাড়ি পরে এসেছে। সবার চোখ জোড়া যেন চিকচিক করছে। সবার চোখেমুখে যেন আনন্দের ছাপখোপ। বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই, কষ্ট নেই, ব্যথা-বেদনা নেই। ফুটের চারপাশ ধরে হকাররা বাঁশি বাজিয়ে চলেছে। নানারকম খেলনা কাঁধে নিয়ে বিক্রি করছে। বেলুনওয়ালা বেলুন ফুলিয়ে সুতোয় বেঁধে শূন্যে উড়িয়ে ঘুরছে। রাস্তার একপাশে ফুটের ওপর চায়ের দোকান কয়েকটি সাজিয়ে বসেছে। অনেকগুলো লোক চা খেতে খেতে গল্প জুড়িয়ে বসেছে। আহা কি আনন্দ! দেখে মনে হয় এটিই ওদের বাসাবাড়ি! আনন্দে আত্মহারা হয়ে মনের সুখে মনের ভাব প্রকাশ করছে। খুব ভালো লাগল তুবার। মায়ের হাত ধরে আরো এগিয়ে গেল ও। বাংলা নববর্ষকে নতুনভাবে বরণ করে নেয়া। কিছু দূর যেতেই তুবার খুব পানি পিপাসা লাগল। মাকে কি বলবে ? যদি বকা দেয়। থাক বলি।

মা, পানি খাবো! অজানা আশঙ্কায় বলেই ফেলল তুবা।

দাঁড়া মা। আরেকটু সামনে যাই। ওখানে দোকান থেকে পানির বোতল নিয়ে নেবো। আচ্ছা মা। তুবা সায় দেয়। আর কতদূর গেলে পান্তা ইলিশ খেতে পারব মা?

পানি খেয়ে আর কিছুক্ষণ হেঁটে গেলেই পাবো বিশাল একটি উদ্যানের প্রবেশপথ। ভেতরে ঢুকে গেলেই দেখবে সারি সারি দোকান! বাউল শিল্পীরা বটমূলে বাংলার গান গাইছে। ঘুরতে আসা বৈশাখী ছেলে-মেয়ে শিশুরা অপলক দৃষ্টিতে সেই গান শুনছে। কেউ পান্তা ইলিশ খেতে ব্যস্ত। কেউ লেকের ভেতর নেমে নৌকা চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সত্যিই তো মা? তুবা বলল মায়ের উদ্দেশে। আমার পাঠ্যবইতেও তো তাই লেখা আছে। এই অপরূপ দৃশ্য নিজ চোখে দেখব। সত্যিই আনন্দের! তাই না মা?

হুম। চলো দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। বাবা ততক্ষণে দোকান থেকে এক বোতল মিনারেল ওয়াটার কিনে নেয়। বোতলের ছিপি খুলে এগিয়ে দেয় তুবার দিকে। অনেক পিপাসায় কাতর তুবা ঢক ঢক করে পানি পান করে। সেই সাথে মা তার গলাটাকেও ভিজিয়ে নেয়। আবার পথচলা শুরু।

মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর উদ্যানের সামনে এসে দাঁড়ায় ওরা। শত শত লোক সারিবদ্ধভাবে ভেতরে ঢুকছে। মা এবার তুবার হাতটা একটু শক্ত করে ধরল। বাবাও মাকে আর তুবাকে হাত দিয়ে নিরাপদে রেখে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে। ভেতরে ঢোকার পর তুবার দুই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল!

এত্ত মানুষ! সবাই সাজুগুজু করে এসেছে! তুবার গায়ে বৈশাখী জামা আর পায়জামা। সাথে ছোট্ট এক টুকরো ওড়না। কাঁধের এক পাশ থেকে আরেক পাশে ঝুলে নেমে এসেছে ছোট্ট ভ্যানিটি ব্যাগ। ধীরে ধীরে একটু সামনে এগিয়ে মচুয়ার পান্তা ইলিশের দোকানে এসে দাঁড়ায়। একটা ছোট্ট ছেলে এগিয়ে এসে স্বাগত জানায়। আসেন স্যার। আমাদের পান্তা ইলিশ খেয়ে যান। স্বাদে অতুলনীয়। মুখে লেগে থাকবে বহুদিন। বাবা মুচকি হেসে তুবা আর মাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। ততক্ষণে ছেলেটি হাত ধোয়ার জন্য একটি পাত্র আর পানি নিয়ে এসে পাশে দাঁড়ায়। একে একে সবার হাত ধোয়া হয়ে গেলে ছেলেটি টিস্যু পেপার এগিয়ে দেয়। বাবা হাত মুছতে মুছতে অর্ডার করলেন তিন প্লেট পান্তা ইলিশের।

মিনিট বিশেক পর সামনে হাজির হলো বাঙালির ঐতিহ্য পান্তা ইলিশ। সাথে কয়েক পদের ভর্তা। বাবা ভাতটাকে একটু ছুঁয়েই হেসে উঠলেন। খোকা তোমাদের পান্তা ইলিশ গরম কেন। এটা তো ঠাণ্ডা হওয়ার কথা।

ছেলেটি খলখল করে হেসে ওঠে। চোখে পড়ল ছেলেটির সামনের পাটির দুটো দাঁত নেই। ফোকলা দাঁতের হাসিতেই বাবা কাবু হয়ে গেলেন।

ওহ আচ্ছা। বলতে বলতে বাবা তুবার দিকে তাকায়।

মা। এটি তোমার পান্তা ইলিশ। খেতে শুরু করো। ভর্তা একটু মুখে দিয়ে দেখো। ঝাল বেশি লাগলে খেয়ো না।

আচ্ছা বাবা। বলেই খেতে শুরু করল তুবা।

চারপাশে বাদ্য বাজনার প্যা পু বাঁশিতে পরিবেশ অস্থির হয়ে উঠেছে। তবু খারাপ লাগছে না।

পান্তা ইলিশের পর্ব সেরে উঠে পড়ল ওরা। বিল চুকিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বটমূলের দিকে। বাউল শিল্পীরা একে একে গান গাইছে সমবেত কণ্ঠে। গান শুনতে শুনতেই হঠাৎ কে যেন হাত ধরে টানতে লাগল তুবার। প্রথমে ভয় পেয়ে যায় ও।

চোখ মেলে তাকায় তুবা। দেখে মা ডাকছে ওর হাত ধরে। মাকে দেখে আদুরে কণ্ঠে বলে, মা আমরা কোথায়?

কেন বাসায়?

না তো মা। আমরা পান্তা ইলিশ খেয়ে বাউল শিল্পীদের গান শুনছিলাম। ওদেরকে দেখতে পাচ্ছি না। ওরা কোথায়?

আমরা তো বাসায় মা। তুমি বটমূলে বৈশাখী মেলায় যাবে আজ আমাদের সাথে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ো মা।

বৈশাখী মেলার কথা শুনে মাকে বলে, কেন মা? তুমি আমি আর বাবা তো বৈশাখী মেলায় ছিলাম। বাসায় এলাম কি করে।

মা এক গাল হেসে বলে, তুমি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলে মা! এবার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হবে। চলো মা, চট জলদি উঠে পড়ো। মেলায় যাবো। মেলায় যাওয়ার কথা শুনে তুবা হাসতে হাসতে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। মেলায় যাইরে গান গাইতে গাইতে চলে গেল বাথরুমের দিকে। হ