ঢাবি ইসলামের ইতিহাস বিভাগ
জুলাই হত্যা মামলার আসামি হলেন বিভাগীয় চেয়ারম্যান
নেপথ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার গুঞ্জন
Printed Edition
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানীকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। হত্যা মামলার পলাতক আসামি ও বিগত সরকারের ‘লাঠিয়াল’ হিসেবে পরিচিত একজন শিক্ষকের এমন পদোন্নতিতে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে চরম বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৭ জানুয়ারি বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান বিশ্বাসের মৃত্যুর পর পদটি শূন্য হয়। সেই শূন্য পদেই জ্যেষ্ঠতার অজুহাতে গতকাল শনিবার (১০ জানুয়ারি) রাতে অধ্যাপক গোলাম রব্বানীকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় এবং তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তবে এই নিয়োগ কেবল ‘প্রশাসনিক রুটিন ওয়ার্ক’ হিসেবে দেখছেন না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্পাসে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, এই নিয়োগের নেপথ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর উচ্চপদস্থ কয়েকজন নেতার প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে। অন্য দিকে গণ-অভ্যুত্থানপন্থী বা বৈষম্যবিরোধী শিক্ষকদের রহস্যজনক নীরবতা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সন্দেহের দানা বাঁধছে।
অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দায়ের করা একাধিক মামলার আসামি। তিনি ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে দায়ের হওয়া একটি মামলায় তিনি ৮ নম্বর আসামি। ওই মামলার প্রধান আসামি পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। এ ছাড়া একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ওবায়দুল কাদেরসহ প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা অভিযুক্ত।
কেবল জুলাই অভ্যুত্থান নয়, অধ্যাপক রব্বানীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে মূলত তার প্রক্টর থাকাকার সময়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তিনি প্রক্টরের চেয়ারে বসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘অভিভাবক’ হওয়ার পরিবর্তে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয়দাতা হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২২ সালে ছাত্রদলের ওপর হামলা, ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরের ওপর হামলা এবং ক্যাম্পাসে গেস্টরুম-গণরুমের নির্যাতন সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তার প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আলটিমেটাম ও ডাকসুর স্মারকলিপি
হত্যা মামলার আসামির এমন পুনর্বাসনে ফুঁসে উঠেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল ১১ জানুয়ারি বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এই নিয়োগ বাতিলের দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছেন ডাকসু ও হল সংসদের নেতারা। একইসাথে তাকে অপসারণসহ সংশ্লিষ্ট সকল ‘ফ্যাসিবাদী’ শিক্ষক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপি প্রদান শেষে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ‘যে শিক্ষক ৩ আগস্ট গণহত্যার সমর্থনে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করেছেন, যার হাতে শিক্ষার্থীদের রক্তের দাগ, তাকে কোনোভাবেই বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে মেনে নেয়া যায় না। প্রশাসন যদি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তবে ছাত্র-জনতা কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবে।’
পুনর্বাসনের নেপথ্যে সমঝোতা
ড. গোলাম রব্বানী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে তার চেয়ারম্যান হওয়া নিয়ে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সমঝোতার গুঞ্জন চলছে। গুঞ্জন রয়েছে, জ্যেষ্ঠতার দোহাই দিয়ে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর নেতৃবৃন্দের মৌন সম্মতি বা সমঝোতা থাকতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক জানান, বিভাগে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে চেয়ারম্যান নিয়োগের রেওয়াজ থাকলেও, একজন হত্যা মামলার আসামি এবং গণ-অভ্যুত্থানবিরোধীকে নৈতিক অবস্থান থেকে আটকে দেয়া যেত। কিন্তু সাদা দলের শিক্ষকরা এ বিষয়ে কার্যত কোনো বাধা দেননি। অন্য দিকে ৫ আগস্টের পর থেকে ক্যাম্পাসে সক্রিয় গণ-অভ্যুত্থানপন্থী শিক্ষকরাও এ বিষয়ে বিস্ময়করভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। এই দুই পরে নীরবতা এবং প্রশাসনের তড়িঘড়ি করে নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘রাজনৈতিক আপসকামিতার’ সন্দেহ সৃষ্টি করেছে।
বিতর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, ‘সবকিছুই নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হয়েছে। আমরা অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান বিশ্বাস স্যারকে হারিয়েছি। তাই নিয়মমাফিক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমি আশা করি আমার শিক্ষার্থীরা এ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখবে।’ জুলাই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ও মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্য দিকে হত্যা মামলার আসামিকে কেন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসানো হলো এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি।
বিভাগের শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সুলতানুল আরেফিন বলেন, গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর শিক্ষার্থীরা ড. রব্বানীর বিরুদ্ধে একাডেমিক বয়কট শুরু করলে তিনি ক্ষমা চেয়ে ক্লাসে ফিরেছিলেন। কিন্তু জুলাই বিপ্লব নিয়ে পরে আপত্তিকর মন্তব্য এবং গোপনে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতাকে পরীক্ষায় অংশ নিতে সহায়তা করার অভিযোগে তিনি ফের বিতর্কিত হন। আজ সোমবারের মধ্যে ড. গোলাম রব্বানীকে অপসারণ করা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় নিতে হবে। ক্যাম্পাসে যখন জুলাইয়ের শহীদদের বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, তখন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা ‘শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানি’ বলে আখ্যায়িত করছেন শিক্ষার্থীরা।