সাক্ষাৎকার : ড. রাশেদ চৌধুরী
অস্বাভাবিক খরা বা বন্যার আশঙ্কা নেই, তবে দীর্ঘমেয়াদে বাড়বে
Printed Edition
গত কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনে পরিচিত আবহাওয়া বদলে গেছে। তা সত্ত্বেও সামনের বছর অস্বাভাবিক খরা অথবা বন্যার তেমন আশঙ্কা নেই। মৌসুমি জলবায়ু পরিবর্তনের একটা প্রভাব থাকলেও যে যে কারণে দীর্ঘ বন্যা অথবা খরা হয়ে থাকে এর পেছনের অনুুসঙ্গগুলো এখনো স্বাভাবিক রয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে তা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশে শুকনো মৌসুমটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত শুকনো হয়ে থাকে। তা এখনো প্রায় স্বাভাবিক রয়েছে। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির রিসার্চ ফ্যাকাল্টি এবং পানি, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. রাশেদ চৌধুরী বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ঘটনাগুলো ঘটতে পারে সেগুলো ব্যাখ্যা করছিলেন। নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা হামিম উল কবির।
নয়া দিগন্ত : বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন কিভাবে হচ্ছে?
রাশেদ চৌধুরী : এতদিন যে বাংলাদেশে শীতল ও সতেজ শীত ছিল; গ্রীষ্ম ছিল তুলনামূলক কোমল এবং বৃষ্টি আসতো নিয়মিত ও পুর্বানুমেয় ধারায়; সেই আবহাওয়া এখন নেই। তখন মৌসুমি বাতাসের এক ধরনের মৃদু ছন্দ ছিল, এক ঋতু থেকে আরেক ঋতুতে যে পরিবর্তন হতো তা স্পষ্টভাবে মনে হতো যেন একটি পরিচিত ও স্বস্তিদায়ক সময়সূচি মেনে চলছে। কিন্তু ধীরে ধীরে আবহাওয়া বদলাতে শুরু করেছে। শীতের সময়টা হয়ে গেলে স্বল্প এবং তুলনামূলক উষ্ণ কিন্তু বিপরীতে গ্রীষ্ম হয়ে গেছে তুলনামূলক দীর্ঘ ও গরম থেকে আরো গরম। বৃষ্টিপাত হয়ে গেল অনিশ্চিত। দেখা যায়, দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ নেমে আসে প্রবল বর্ষণ। যেখানে আগে কখনো বন্যা হতো না, সেখানেও বন্যা দেখা যাচ্ছে। অতীতের সেই পরিচিত আবহাওয়ার যে ধারা বাংলাদেশে ছিল সেটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
নয়া দিগন্ত : এল নিনো ও লা নিনো ঘটনায় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়?
রাশেদ চৌধুরী : জলবায়ুতে পরিবর্তন এসেছে। এল নিনো সাউদার্ন অসিলেশন বা (ইএনএসও) যা আবহাওয়ার ওপর তীব্র প্রভাব ফেলে সেটা এক সময় ৫ থেকে ৭ বছর পরপর দেখা দিত। আবার জলবায়ুতে যেসব বড় বড় ঘটনা ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে একবার করে ঘটত, সেগুলো এখন তুলনামূলক বেশি ঘন ঘন প্রায় ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যেই ঘটছে। জলবায়ুতে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশগুলো কখনো কখনো প্রায় প্রতি বছরই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এসব পরিবর্তন আমাদের ঋতুচক্রে ঢেউয়ের মতো প্রভাব ফেলছে, আবহাওয়াকে করে তুলছে আরো অনিশ্চিত এবং আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে পৃথিবীর আবহাওয়ায় আমরা বড় হয়েছি সেগুলোতে ধীরে ধীরে স্পষ্টরূপেই পরিবর্তন আসছে। ধরুন, প্রশান্ত মহাসাগর একটি বিশাল হৃদস্পন্দনের মতো, যেখানে উষ্ণ ও শীতল পানি ওঠানামা করে। সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে উঠলে সেটাকে এল নিনোর ঘটনা ধরা হয়। আবার কখনো কখনো প্রশান্ত মহাসাগরের পানি অপেক্ষাকৃত বেশি ঠাণ্ডা হয়ে ওঠে, সেটাকে লা নিনোর ঘটনা হিসেবে ধরা হয়। সমুদ্রের এই মেজাজ বায়ু মণ্ডলের মাধ্যমে অদৃশ্য সঙ্কেত পাঠায়, আর আমরা দক্ষিণ এশিয়ায় সেগুলোর প্রভাব অনুভব করি। আবহাওয়ার পরিবর্তন হিসেবে কখনো কখনো বেশি বৃষ্টি, কখনো কখনো দীর্ঘ খরা, কখনো অতিরিক্ত গরম গ্রীষ্ম, আবার কখনো কখনো শীতকালে বেশি ঠাণ্ডা শীতের ঘটনা ঘটে। বিজ্ঞানীরা এই পুরো চক্রকে ইএনএসও হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বছরের পর বছর আবহাওয়ার ভিন্নতা থাকার পেছনে এই ইএনএসও অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নয়া দিগন্ত : এসব তথ্য সাধারণ মানুষের কী কাজে লাগতে পারে?
রাশেদ চৌধুরী : কৃষকরা কখন চাষ করবেন আর ফসল কাটবেন, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। পানি ব্যবস্থাপনায় থাকা মানুষরা খরা বা বন্যার আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে পারেন। শহরগুলো তাপপ্রবাহ বা ঝড় মোকাবেলায় প্রস্তুত হতে পারে। শুধু এটুকু জানতে পারলেই পরিকল্পনা নিতে সহায়ক হতে পারে যে, কোন মৌসুমটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ভেজা হতে পারে অথবা শুষ্ক হতে পারে। তাহলে জীবনকে সাজাতে পারে, মানুষ ঘরবাড়ি রক্ষা করতে পারে এবং মানুষ সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে পারে। এই অর্থে ইএনএসও হলো প্রকৃতিতে আবহাওয়ার ক্যালেন্ডার। ঝড়, বন্যা অথবা দীর্ঘ খরা আসার আগেই এর সুক্ষ্ম ইঙ্গিত পড়তে সহায়তা করে। দক্ষিণ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সংঘটিত একই ঝড় ভিন্ন ভিন্ন জায়গা ভিন্নভাবে অনুভূত হয়ে থাকে। তাপপ্রবাহ বা খরার ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা যায়। কৃষক ও জেলেরা, যাদের দৈনন্দিন আয় সরাসরি জমি বা সাগরের ওপর নির্ভরশীল, তারা সাথে সাথে এর প্রভাব অনুভব করেন ফসল নষ্ট হওয়ার মাধ্যমে, মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায়।
নয়া দিগন্ত : আবহাওয়া ধনী ও গরিবের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে কিভাবে?
রাশেদ চৌধুরী : ধনী পরিবারগুলো গরমে এসি চালাতে পারে, পানির অভাব ঘটলে বোতলজাত পানি কিনতে পারে কিন্তু দরিদ্ররা পারে না। এইএনএসওর ব্যাপারটা বুঝাতে পারলে তারাও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাতের তীব্রতা কমিয়ে আনতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের অনেক বেশি সরাসরি ও তীব্রভাবে অনুভব করে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতায় পরিবর্তন, শক্তিশালী ঝড়, খরা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন শুধু বাড়িঘর, খাদ্য ও পানির ওপরই নয়, পবিত্র স্থান, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও পরিচয়ের ওপরও হুমকি সৃষ্টি করে। এই জনগোষ্ঠীগুলো বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে খুব কম অবদান রাখলেও এর সবচেয়ে বড় তির বোঝা তাদেরই বইতে হয়। তারা টিকে থাকতে ঐতিহ্যগত জ্ঞান, স্থানীয় অভিযোজন এবং সামাজিক সংহতির ওপর নির্ভর করে। বিপরীতে, ধনী জনগোষ্ঠী প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সম্পদের মাধ্যমে নিজেদের অনেকটাই সুরতি রাখতে পারে, ফলে তাদের জীবনে সাংস্কৃতিক বা অস্তিত্বগত ধাক্কা তুলনামূলকভাবে কম লাগে।