রাসূল সা:-এর শিক্ষায় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি
Printed Edition
মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
আজকের যুগে ইতিবাচক চিন্তার গুরুত্ব আমাদের কারো কাছেই অজানা নয়। বিশ্বজুড়ে মোটিভেশনাল বক্তা ও মনোবিজ্ঞানীরা এর অসাধারণ প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছেন। বিশেষ করে হতাশা (ডিপ্রেশন) ও মানসিক রোগে ভোগা ব্যক্তিদের জন্য মনকে ইতিবাচক রাখা প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।
এমন পরিস্থিতিতে একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের প্রথম কর্তব্য হলো, অন্য কারো ভরসা নেয়ার পরিবর্তে সর্বাগ্রে আমাদের প্রিয়নবী সা:-এর বহুমাত্রিক ও সর্বাঙ্গীন শিক্ষার ভেতরেই এর সমাধান অনুসন্ধান করা। রাসূলুল্লাহ সা:-এর বরকতময় বাণীর আলোকে ইতিবাচক চিন্তার গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা এবং এর পদ্ধতি অনুধাবন করে তা বাস্তবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করাই এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক চিন্তার দু’টি মূল দিক রয়েছে : ১. নিজেকে ইতিবাচক রাখা, এবং ২. সমাজকেও ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা।
নিজেকে ইতিবাচক রাখার উপায় : ব্যক্তিগত জীবনে ইতিবাচক মানসিকতা বজায় রাখার জন্য মহানবী সা: আমাদের সুস্পষ্ট পথ দেখিয়েছেন।
প্রথম উপায় : শুভলক্ষণ গ্রহণ করার অভ্যাস গড়ে তোলা।
রাসূলুল্লাহ সা:-এর ইতিবাচক চিন্তারই একটি অংশ ছিল যে, তিনি শুভলক্ষণ (নেক ফালি) গ্রহণ করতেন এবং অশুভলক্ষণ গ্রহণ করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। শুভলক্ষণ মূলত আল্লাহর প্রতি ভালো ধারণা এবং ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী হওয়ার একটি প্রকাশ।
রাসূল সা: বলেছেন : ‘রোগ একে অন্যকে সংক্রমিত করে না। অশুভলক্ষণ বলে কিছু নেই; বরং আমি শুভলক্ষণকে ভালোবাসি, আর শুভলক্ষণ হলো, কোনো ভালো কথা শোনা।’ (বুখারি: ৫৭৫৬) অন্য বর্ণনায় রয়েছে, নবী সা: যখনই কোনো কাজে বের হতেন, তিনি এমন কিছু শুনতে পছন্দ করতেন (যেগুলো দ্বারা শুভলক্ষণ বুঝায়) যেমন : ‘ইয়া রাশিদ’ (হে সঠিক পথে চলা ব্যক্তি), বা ‘ইয়া নাজীহ’ (হে সফল ব্যক্তি)। (সুনানে তিরমিযি : ১৬১৬)
এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা যায় হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়। মক্কার কাফেররা যখন কঠোরভাবে বাধা দিচ্ছিল, ঠিক তখনই কুরাইশদের প্রতিনিধি সুহাইল ইবনে আমর আসতে দেখে রাসূল সা: সাহাবিদের উদ্দেশ করে বললেন : ‘নিশ্চয়ই তোমাদের ব্যাপার এখন সহজ হয়ে গেল।’ (বুখারি : ২৭৩৩)।
কারণ, সুহাইল নামের অর্থ হলো, ‘খুব সহজ’। এখান থেকে রাসূল সা: শুভলক্ষণ গ্রহণ করেছেন। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সাহাবিদের মধ্যে ইতিবাচকতা সৃষ্টি করলেন।
দ্বিতীয় উপায় : ইতিবাচক থাকতে হলে ইতিবাচক মানুষের সাথে থাকতে হবে। মানুষ তার সাথীর স্বভাব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। তাই মনকে ইতিবাচক রাখতে হলে অবশ্যই ইতিবাচক প্রকৃতির মানুষের সাথে মিশতে হবে।
রাসূল সা: বলেছেন : ‘মানুষ তার বন্ধুর মতো চলে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকের ভেবে দেখা উচিত, সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে।’ (সুনানে আবি দাউদ : ৪৮৩৩)
এই হাদিস থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, বন্ধুত্ব মানুষের স্বভাব ও চরিত্রের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। ইতিবাচক মানুষের সাথে আমাদের মনে আশা, সাহস ও আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করে।
হজরত খাদিজা রা: কর্তৃত্ব ইতিবাচক মানসিকতা গঠন করা : প্রথমবার ওহি নাজিলের পর নবী সা: যখন ভয় ও শারীরিক কষ্টে ভুগছিলেন, তখন হজরত খাদিজা রা: তাঁর স্বামী রাসূল সা: ইতিবাচক দিকগুলোতে মনোযোগী করিয়েছিলেন। তিনি রাসূল সা:-এর গুণাবলি একে একে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কখনোই না! আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমান করবেন না। নিশ্চয়ই আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, দুর্বলদের সহায়তা করেন, অভাবীদের জন্য উপার্জন করেন, অতিথিকে আপ্যায়ন করেন এবং সত্যের প্রয়োজনে সহযোগিতা করেন।’ (বুখারি-৩)
এটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির এক উজ্জ্বল উদাহরণ, স্বামী যখন চরম মানসিক কষ্টের মধ্যে, স্ত্রী তখন তার অতীতের ভালো কাজগুলো স্মরণ করিয়ে তাকে শান্তি ও আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছেন।
তৃতীয় পদ্ধতি : নিজের থেকে নি¤œস্তরের মানুষদের দিকে তাকানো। দুনিয়াবি বিষয়ে নিজের চেয়ে নি¤œস্তরের মানুষদের দিকে দৃষ্টি রাখলে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জন্মায়, যা মনকে ইতিবাচক রাখতে সাহায্য করে। রাসূল সা: বলেন, ‘তোমরা নিজেদের থেকে নিচে অবস্থানকারীদের দিকে তাকাও, আর যারা তোমাদের উপরে আছে তাদের দিকে তাকিও না। এর ফলে তোমরা আল্লাহর নেয়ামতকে অবজ্ঞা করবে না।’ (বুখারি) এই অভ্যাস আমাদের মনকে অপ্রাপ্তির হতাশা থেকে মুক্ত করে প্রাপ্তির জন্য কৃতজ্ঞ ও আশাবাদী করে তোলে।
সমাজকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা : ইতিবাচক চিন্তার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানুষের ভালো দিকগুলো দেখা এবং তাদের ভুলত্রুটির পেছনে না পড়া। সামাজিকভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টির প্রক্রিয়াগুলো হলো :
মানুষকে ক্ষমা করা : হজরত উসামা ইবনে যায়েদ রা: এক অভিযানে শত্রুপক্ষের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেন, যদিও সে ব্যক্তি শেষ মুহূর্তে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলেছিল। এ সংবাদ শুনে রাসূল সা: অত্যন্ত মর্মাহত হলেন এবং বারবার বলতে থাকলেন : হে উসামা! তুমি কি তাকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পরও হত্যা করেছ? (বুখারি : ৪২৬৯)
রাসূল সা: এই কথাটির মাধ্যমে উসামা রা:-কে শিক্ষা দিলেন যে, একজন মানুষের অন্তরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। যখন কেউ ইসলামের সাক্ষ্য দেয়, তখন আমাদের উচিত বাহ্যিকতাকে গ্রহণ করা এবং তার ভেতরের উদ্দেশ্যকে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়া। এটি সমাজের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক শিক্ষা।
জীবনের অপ্রত্যাশিত ঘটনাকে ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা : জীবনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা বা অস্বাভাবিকত্বকে আল্লাহর ইচ্ছার ইতিবাচক ব্যাখ্যা দেয়াও রাসূল সা:-এর শিক্ষা।
একবার জনৈক বেদুঈন রাসূল সা:-এর কাছে এসে বলল, আমার স্ত্রী একটি কালো সন্তান প্রসব করেছে। আর আমি তাকে (আমার সন্তান হিসাবে) অস্বীকার করছি। রাসূল সা: বললেন : তোমার কি উট আছে? সে বলল হ্যাঁ আছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সেগুলোর কি রং? সে বলল, লাল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সেগুলোর মাঝে সাদা কালো মিশ্রিত রঙের কোনো উট আছে কি? সে বলল, হ্যাঁ, সাদা কালো মিশ্রিত রঙের অনেকগুলোই আছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন এ রং কি করে এলো বলে তুমি মনে কর? সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! বংশের পূর্ব সূত্রের প্রভাবে এরূপ হয়েছে। তিনি বললেন : সম্ভবত তোমার সন্তানও বংশের পূর্ব সূত্রের প্রভাবে এরূপ হয়েছে (অর্থাৎ পূর্বপুরুষের কারো বর্ণ কালো ছিল বলে এ সন্তান কালো হয়েছে) এবং তিনি এ সন্তানকে অস্বীকার করার অনুমতি তাকে দিলেন না। (বুখারি : ৭৩১৪)
এই হাদিসের মাধ্যমে নবীজি সা: দেখালেন যে, বংশগতি একটি জটিল বিষয়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে যা অস্বাভাবিক, তা আসলে প্রাকৃতিক নিয়ম এবং পূর্বপুরুষের প্রভাবেরই ফল হতে পারে। এর মাধ্যমে তিনি লোকটির মানসিক দ্বন্দ্ব দূর করলেন এবং তার মনকে সন্তানের প্রতি ইতিবাচক ও সহনশীল হতে শেখালেন।
রাসূলুল্লাহ সা:-এর পবিত্র জীবন ও শিক্ষা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। শুভলক্ষণ গ্রহণ, নেতিবাচক সঙ্গ পরিহার করে ইতিবাচক মানুষের সাহচর্য গ্রহণ, আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং সমাজের মানুষকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মাধ্যমেই আমরা ইসলামের আলোকে সত্যিকারের ইতিবাচক মানসিকতা অর্জন করতে পারি। এই শিক্ষাগুলো অনুসরণ করে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে আরো সুন্দর ও ফলপ্রসূ করতে পারি।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া নুরিয়া ইসলামিয়া কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা।