সুঁই-সুতার নকশি কাঁথায় উষ্ণতা

Printed Edition
bangla-5
মুন্সীগঞ্জে নকশি কাঁথা সেলাই করছেন দুই নারী : নয়া দিগন্ত

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

পৌষের কনকনে শীত নামলেই মুন্সীগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে যেন নতুন করে প্রাণ পায় নকশি কাঁথার ঐতিহ্য। আধুনিক লেপ-কম্বলের দাপটের মধ্যেও পুরনো কাপড়, রঙিন সুঁই-সুতা আর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় গ্রামীণ নারীরা ধরে রেখেছেন শতাব্দীপ্রাচীন এই সূচিশিল্প। শীতের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি নকশি কাঁথা আজ হয়ে উঠেছে সংস্কৃতি, স্মৃতি ও জীবিকার এক অনন্য সমন্বয়।

জেলার সদরসহ সিরাজদিখান, লৌহজং ও টংগিবাড়ী উপজেলার গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায়, দিনের কাজ শেষে উঠোন কিংবা খোলা আঙিনায় বসে কাঁথা সেলাই করছেন গৃহবধূ, কলেজপড়–য়া তরুণী ও প্রবীণ নারীরা। মা, খালা কিংবা শাশুড়ির কাছ থেকে শেখা এই শিল্প মুসলিম ও হিন্দু, উভয় সম্প্রদায়ের নারীদের হাত ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্মে টিকে আছে। প্রতিটি কাঁথায় ফুটে ওঠে ফুল, লতা, পাখি কিংবা গ্রামীণ জীবনের নানা চিত্র, যা নীরবে গল্প বলে জীবনের সুখ-দুঃখের।

নকশি কাঁথা শুধু ঘরের শীত নিবারণের উপকরণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস। ইতিহাসবিদদের মতে, সূচিশিল্পের চর্চা পাওয়া যায় প্রাচীন হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা থেকে শুরু করে মিশর ও গ্রিসের নিদর্শনে। বাংলার নকশি কাঁথা সেই ধারাবাহিক ঐতিহ্যেরই এক জীবন্ত রূপ, যা আজও গ্রামবাংলায় সক্রিয়ভাবে চর্চিত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে। শম্পা রানী পাল নামের এক গৃহবধূ জানান, ঘরে বসে কাঁথা সেলাই করে সংসারের বাড়তি আয় হচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা শ্রাবণী আক্তার বিথী বলেন, একটি নকশি কাঁথা বানাতে চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। তিন থেকে সাড়ে চারশ টাকা খরচে তৈরি কাঁথা মানভেদে ৯০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হয়। এতে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে চ্যালেঞ্জও। স্থানীয় গৃহবধূ চম্পা মনে করেন, সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও স্থায়ী বাজার ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে নকশি কাঁথা শিল্প আরও বিস্তৃত হতে পারে। জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী জানান, নারীদের কর্মসংস্থান ও ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংরক্ষণে সরকার কাজ করছে এবং নকশি কাঁথাসহ গ্রামীণ সূচিশিল্পে যুক্ত নারীদের পাশে জেলা প্রশাসন থাকবে।

শীতের সকালে মুন্সীগঞ্জের গ্রামবাংলায় সুঁই-সুতার ফোঁড়ে যখন কাঁথা সেলাই হয়, তখন তা শুধু শীতের উষ্ণতা নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক জীবন্ত ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।