আবারো ধারাবাহিক পতনের দিকে পুঁজিবাজার

ধৈর্য ধরার পরামর্শ বিশ্লেষকদের

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনে এসে আরো বড় পতন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। এর আগে রোববারও দুই বাজারে সূচকের বড় ধরনের পতন ঘটে। কিন্তু সোমবারের পতনের মাত্রা ছিল আরো বেশি। লেনদেনের শুরু থেকে বিক্রয়চাপ তৈরি হওয়া বাজারগুলোর লেনদেন যতই এগিয়ে যাচ্ছিল ততই বাড়ছিল এ চাপ। কোম্পানি, বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ড সব খাতের চলছিল এ পতন। এ দিন ঢাকা শেয়ারবাজারে দর হারায় ৮২ শতাংশের বেশি কোম্পানি ও ফান্ড যা দিনশেষে সূচকের বড় অবনতি ঘটায়।

বিনিয়োগকারীরা গত দু’দিনের বাজার আচরণে খুবই হতাশ। তারা মনে করছেন আবারো ধারাবাহিক পতনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে বাজার। এর আগে দীর্ঘদিন পতনের শিকার হওয়া বাজারগুলো গত দু’সপ্তাহে কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পেতে শুরু করছিল। এরই মধ্যে আবার নতুন করে পতন শুরু হলো। গতকাল মতিঝিলের বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরে গিয়ে জানতে চাইলে বিনিয়োগকারীরা নয়া দিগন্তকে তাদের এই হতাশার কথা জানান। তাদের একটি বড় অংশই পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তকেই বাজারের এহেন অবস্থার জন্য দায়ী বলে মনে করেন। নয়া দিগন্তকে তারা বলেন, গত ক’দিন আগে বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগের খবরে বাজারের নেতিবাচক প্রবণতা কেটে যায়। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের খবর প্রকাশ পায়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এসব গুজব। তাই আবারো নেতিবাচক প্রবণতা ভর করেছে বাজারে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৬৪ দশমিক ০৪ পয়েন্ট হারায়। চার হাজার ৯৭৮ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে নেমে আসে চার হাজার ৯১৪ দশমিক ৭২ পয়েন্টে। এর আগে রোববারও বাজারটি প্রধান সূচকের ৪৯ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট হারিয়েছিল। সে হিসাবে গত দু’দিনে সূচকটির অবনতি ঘটে ১১৩ দশমিক ৪১ পয়েন্ট। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ২১ দশমিক ৩২ ও ১৬ দশমিক ৪১ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই এদিন ১২৪ দশমিক ১৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ১৩ হাজার ৯৭৬ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট থেকে যাত্রা করা সূচকটি গতকাল লেনদেন শেষে ১৩ হাজার ৮৫২ দশমিক ২১ পয়েন্টে এসে স্থির হয়। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স হারায় যথাক্রমে ৮০ দশমিক ৬৩ ও ৭৩ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ মুহূর্তে বাজারে এ ধরনের পতনের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সচরাচর দেখা যায় ডিসেম্বরের শেষদিকে এসে বাজারে কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতা থাকে। এটাও সাময়িক। এ সময় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বছর শেষ হয়। এ সময় তারা বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে যেখানে মুনাফা ও লোকসান সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করতে হয়। সে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকা শেয়ার বিক্রি করতে গিয়ে বাজারে বিক্রয়চাপ তৈরি হয়। কিন্তু এখন ডিসেম্বর শুরু হচ্ছে। এ সময় এত বিক্রয়চাপ থাকার কোনো কারণ নেই। তারা এমনও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ডিসেম্বর মাসকে সামনে রেখে সক্ষম বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বাজারে বিক্রয়চাপ বাড়িয়ে মূল্যস্তর কমাতে চাইছে যাতে কমদামে শেয়ার কিনে ডিসেম্বরের শেষদিকে তা বিক্রি করতে পারেন। তাই এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের গুজবের দ্বারা তাড়িত না হয়ে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন তারা। কারণ বিনিয়োগকারীরা লোকসান দিয়ে শেয়ার বিক্রি না করলে এত চাপ সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। তাই এ ধরনের বাজার আচরণে নিজেদের পুঁজির সুরক্ষায় ধৈর্যের বিকল্প নেই।

সূচকের অবনতির ফলে গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেন হ্রাস পায়। ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকল ৪১৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ৭৭ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৪৯২ কোটি টাকা। অপরদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন নেমে আসে তিন কোটি টাকায়। এটি পুঁজিবাজারটির সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনি¤œ লেনদেন।

ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ। ২২ কোটি ৪২ লাখ টকায় কোম্পানিটির ৮২ লাখ ৬১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকল। ১৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় ২৮ লাখ ৭০ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডার্স, আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং, ইনটেক অনলাইন, রহিমা ফুড করপোরেশন, একমি পেস্টিসাইডস, সোনালি পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, মুন্নু ফ্যাব্রিকস ও বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার।

গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৮টি কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে মাত্র ২৮টির। দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে গতকাল ডিএসইর শীর্ষ কোম্পানি ছিল প্রকৌশল খাতের বিডি থাই লিমিটেড। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া বিডি থাই ফুড গতকাল এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে জায়গা করে নেয়। মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেড, ফু ওয়াং ফুডস, ইনটেক অনলাইন, একমি পেস্টিসাইডস, গোল্ডেন সন, ফু ওয়াং সিরামিকস, বাংলাদেশ রিল্ডিং সিস্টেমস ও ডমিনেজ স্টিল বিল্ডার্স।

ডিএসইতে গতকাল দরপতনের শিকার ছিল ৩২২টি কোম্পানি ও ফান্ড। দিনের দরপতনের শীর্ষে ছিল ফার ইস্ট ফিন্যান্স। ১০ শতাংশ দর হারায় আর্থিক খাতের এ প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসও ১০ শতাংশ দর হারায়। ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল জিএসপি ফিন্যান্স। উল্লেখযোগ্য দরপতনের শিকার অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে নুরানি টেক্সটাইলস ৯ দশমিক ০৯, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স ৮ দশমিক ৬৪, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ৮ দশমিক ৬১, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল ৮ দশমিক ৫৭, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৮ দশমিক ০৮ ও বিআইএফসি ৮ শতাংশ দর হারায়।