পাকিস্তানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ফের বৈঠকের সম্ভাবনা
মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ফের শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ জন্য ইরানের প্রতিনিধিদলের গতরাতেই ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আল আরাবিয়া সংবাদদাতার কাছে পাকিস্তানের একটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি একটি ছোট প্রতিনিধিদল নিয়ে শুক্রবার রাতে ইসলামাবাদে পৌঁছাতে পারেন। রয়টার্সের খবর অনুযায়ী, আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের লজিস্টিক এবং নিরাপত্তা দল ইতোমধ্যে ইসলামাবাদে অবস্থান করছে। গত ১১ এপ্রিল প্রথম দফার দীর্ঘ আলোচনার পর পাকিস্তান এই যুদ্ধ বন্ধে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে তেহরান এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য প্রতিনিধি পাঠাতে কিছুটা অনীহা দেখাচ্ছিল।
এই অগ্রগতি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং আরাকচি ফোনালাপে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ও পাকিস্তানের চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতর বলেছে, দুই পক্ষই আঞ্চলিক পরিস্থিতি, যুদ্ধবিরতি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপের প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদ যে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে, তা নিয়ে মতবিনিময় করেছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দফতর আরো জানায়, ইসহাক দার জোর দিয়ে বলেছেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের জন্য ধারাবাহিক সংলাপ ও সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাতে যত দ্রুত সম্ভব আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়। অন্য দিকে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের ধারাবাহিক ও গঠনমূলক মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা করেন। পররাষ্ট্র দফতর আরো জানায়, দুই নেতা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখতে সম্মত হয়েছেন।
গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পাকিস্তান তার কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। তবে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার আলোচনা বিলম্বিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে বিশেষ করে, ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপের বিষয়টি নিয়ে।
বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত নাটালি বেকারের সাথে ‘গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক’ করেন। সেখানে তারা ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে বৈঠক করেন। এর আগে, গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন যে পারস্পরিক অবিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই দ্বিতীয় দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে পারে। তিনি বলেন, এটা সম্ভব! উল্লেখ্য, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির পর ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দফার ঐতিহাসিক সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়, তবে তা ভেঙেও যায়নি।
আইআরজিসি কমান্ডার ও নৌপথ লক্ষ্যবস্তু করবে যুক্তরাষ্ট্র
সিএনএনের খবর অনুযায়ী, বর্তমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে ইরানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামরিক বিকল্প বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রাথমিক পরিকল্পনায় আলোচনার পথে বাধা সৃষ্টিকারী ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করার দিকে নজর দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে একটি বিকল্প হলো নির্দিষ্ট সামরিক নেতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালানো। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদি অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।
ব্যক্তিগত লক্ষ্যবস্তু ছাড়াও মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাবিদরা ইরানের সামুদ্রিক সক্ষমতার ওপর ব্যাপক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হরমুজ প্রণালী, দক্ষিণ আরব উপসাগর এবং ওমান উপসাগরে ইরানের ছোট দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌকা এবং মাইন স্থাপনকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে ‘ডাইনামিক টার্গেটিং’ এর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে। এ ছাড়া ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো এবং অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতেও হামলার পথ খোলা রাখা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর এই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করলেও জানিয়েছে যে, সব বিকল্পই টেবিলের ওপর রয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরানি নেতৃত্ব বর্তমানে অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত, যদিও ইরানি কর্মকর্তারা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আলোচনায় পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি ইইউর
ইইউ পররাষ্ট্র নীতি প্রধান কাজা ক্লাস শুক্রবার বলেছেন যে, ইরানের সাথে আলোচনায় পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, অন্যথায় ‘আমরা আরো বিপজ্জনক ইরানকে দেখতে পাবো।’ সাইপ্রাসে ইইউ নেতাদের অনানুষ্ঠানিক সম্মেলনের আগে তিনি সতর্ক করেন যে, চুক্তিটি যদি জেসিপিওএ এর চেয়ে দুর্বল হয় এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে দেয়া সমর্থন নিয়ে আলোচনা না হয়, তবে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর কথা জানাল ইসরাইল
এ দিকে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠকের পর্দার আড়ালের প্রচেষ্টা চললেও, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কান সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো ছাড় দিতে রাজি হচ্ছে না। হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ইসরাইল এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষায় রয়েছে। ইসরাইল ওয়াশিংটনকে বার্তা পাঠিয়েছে যে তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করতে আগ্রহী। ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে অতিরিক্ত এফ/এ-১৮ যুদ্ধবিমান এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে তাদের উপস্থিতি আরো শক্তিশালী করেছে। একটি ইসরাইলি সূত্র জানিয়েছে যে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। এমনকি ইরানের শীর্ষ নেতা মোজতবা খামেনেইকে হত্যার হুমকিও দিয়েছে ইসরাইল। লেবানন প্রসঙ্গে ট্রাম্প তিন সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, যদিও হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হামলা চলছে।
অভ্যন্তরীণ বিভক্তির খবর প্রত্যাখ্যান ইরানের
ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ ট্রাম্পের করা অভ্যন্তরীণ কোন্দলের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। পেজেশকিয়ান বলেন, ‘ইরানে কোনো কট্টরপন্থী বা উদারপন্থী নেই; আমরা সবাই ইরানি এবং বিপ্লবী।’ তিনি জাতির ইস্পাতকঠিন ঐক্য এবং শীর্ষ নেতার প্রতি আনুগত্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন যে ইরানের ভেতরে নেতৃত্বের মধ্যে কে আসল নেতা তা নিয়ে ‘পাগলাটে’ কোন্দল চলছে।
২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালী অতিক্রম মাত্র পাঁচটি জাহাজের
ইরান কর্তৃক দু’টি কনটেইনার জাহাজ জব্দ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধের পর গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে মাত্র পাঁচটি জাহাজ চলাচল করেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে যেখানে ১৪০টি জাহাজ চলত, সেই তুলনায় এটি খুবই কম। বর্তমানে শিপিং কোম্পানিগুলো এই পথ ব্যবহারের জন্য একটি স্থিতিশীল যুদ্ধবিরতি এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা খুঁজছে। ইরানের পতাকাবাহী এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত তেলবাহী ট্যাঙ্কার ‘নিকি’ কোনো গন্তব্য উল্লেখ ছাড়াই এই নৌপথ দিয়ে বের হয়ে গেছে। শিপিং বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী বর্তমানে জাহাজ ও নাবিকদের জন্য নিরাপদ নয়। এই অচলাবস্থার কারণে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সঙ্কট সৃষ্টি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন
এ দিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) গতকাল শুক্রবার জানিয়েছে যে কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী গ্রুপ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে। এগুলো হলো ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন, ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এবং ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ। এতে ২০০টিরও বেশি যুদ্ধবিমান এবং ১৫ হাজার নাবিক ও নৌসেনা রয়েছে। গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও এই বিশাল সামরিক উপস্থিতি উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে, পরবর্তী কয়েক দিন বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদে যদি কোনো কার্যকরী আলোচনা শুরু না হয়, তবে এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যেকোনো সময় একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।