কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নাটকীয় পালাবদল
বিদায় ড. মনসুর, নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকে আবার বড় ধরনের প্রশাসনিক ও নীতিগত পরিবর্তন ঘটেছে। সরকারের এক প্রজ্ঞাপনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল এবং নতুন গভর্নর হিসেবে মো: মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে জারি করা পৃথক দু’টি প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ দিকে সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে থেকেই গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। দুপুরের দিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে গভর্নর অপসারণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ড. আহসান এইচ মনসুর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না দিয়ে হঠাৎ করেই কার্যালয় ত্যাগ করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পদত্যাগ করেননি বরং গণমাধ্যমের মাধ্যমে অপসারণের খবর শুনেছেন। তার এই আকস্মিক প্রস্থান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তাৎক্ষণিক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
ড. মনসুর ২০২৪ সালের আগস্টে এমন একসময় গভর্নরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার পালিয়ে যান। ড. মনসুর দায়িত্ব নেয়ার থেকেই ব্যাংক একীভূতকরণ, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নানা উদ্যোগ নেন। তবে এসব পদক্ষেপকে ঘিরে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেই ব্যাংক লুটেরাদের সমর্থিত একটি গোষ্ঠী শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা ড. আহসান এইচ মনসুর গতকাল বিদায় বেলায় অকপটে স্বীকার করেন। তিনি যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের বলেন, একটি ‘কুচক্রী মহল’ মার্জার হওয়া ব্যাংকগুলোর পুনরুদ্ধার ঠেকাতে অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এসব ব্যাংক আবার আগের মালিকদের হাতে ফিরে যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন কর্মকর্তার শোকজ নোটিশ ও বদলি প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি না মানা হলে বৃহস্পতিবার থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলম বিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তিনি জানান, ব্যাংক একীভূতকরণ (মার্জার) ও দুর্বল ব্যাংক উদ্ধারের প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘ষড়যন্ত্র’ ও ‘অপপ্রচার’ হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার অধিকার নেই সরকারি নীতিগত বিষয়ে প্রশ্ন তোলার। এটি তাদের আওতাভুক্ত বিষয় নয়। যারা অপপ্রচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে শোকজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। শোকজের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হলে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। চাকরি করব, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মানব না এটি গ্রহণযোগ্য নয়। কর্মকর্তাদের আন্দোলন ও পদত্যাগের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, পদত্যাগ কোনো ইস্যু নয়। আমি এখানে চাকরি করতে আসিনি, সেবা দিতে এসেছি। প্রয়োজন হলে দুই সেকেন্ড লাগবে না পদত্যাগ করতে। তবে আমরা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।
অন্য দিকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো: মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী তাকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দায়িত্ব নেয়ার আগে তাকে অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে কর্ম-সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য এবং একটি পোশাক কারখানার উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। ফলে শিল্প খাত থেকে আসা একজন ব্যক্তির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ড. মনসুর দায়িত্বে থাকাকালে সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর টাকা ফেরৎ দেয়ার লক্ষ্যে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে ৩২ হাজার কোটি টাকার সহায়তা দেয়। এর মধ্যে সরকার দেয় ২০ হাজার কোটি টাকা এবং ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স ফান্ড থেকে দেয়া হয় ১২ হাজার কোটি টাকা। তিনি দাবি করেছিলেন, এই পদক্ষেপের ফলে ধীরে ধীরে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরছে এবং আমানতকারীরা তাদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন।
নতুন গভর্নরের নিয়োগের মধ্য দিয়ে সরকার স্পষ্টতই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে চেয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং আর্থিক খাতের সংস্কার এসব বিষয় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে এই আকস্মিক পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং নীতিগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা সবকিছুই গভর্নরের নেতৃত্বের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। শিল্প খাত থেকে আসা নতুন গভর্নর বাস্তব অর্থনীতির সাথে আর্থিক নীতির সমন্বয় ঘটাতে পারেন কি না, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।
এ দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের অস্থিরতা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে আর্থিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংক একীভূতকরণ, খেলাপি ঋণ, তারল্য সঙ্কট এবং আমানতকারীদের আস্থার মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো এখন নতুন নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র।
সব মিলিয়ে ড. আহসান এইচ মনসুরের অপসারণ এবং মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদল। এটি শুধু ব্যক্তির পরিবর্তন নয় বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নীতি, সংস্কার কর্মসূচি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। এখন দেখার বিষয়, নতুন গভর্নরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কাটিয়ে আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে কতটা সফল হয়।