এফডিআই বাড়লেও মিলছে না প্রত্যাশিত সুফল

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বাংলাদেশে বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন দেখা গেলেও এর বাস্তব প্রতিফলন শিল্প খাত, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরে দৃশ্যমান নয়। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও তার বড় অংশ উৎপাদনমুখী নয়; বরং আমদানি ও বিপণনকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশে নতুন শিল্পভিত্তি গড়ে ওঠার গতি আশানুরূপ নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশে এসেছে ৩১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশী বিনিয়োগ, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট এফডিআই দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

সংখ্যার এই উল্লম্ফন প্রথম দেখায় আশাব্যঞ্জক মনে হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, সামগ্রিক অর্থনীতির আকারের তুলনায় এ বিনিয়োগ এখনো খুবই সীমিত। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় এফডিআইয়ের অনুপাত মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে বিনিয়োগের গুণগত মান। অনেক বিদেশী প্রতিষ্ঠান দেশে বড় শিল্প কারখানা স্থাপন না করে বিদেশ থেকে প্রস্তুত পণ্য এনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে। কাগজে এসব বিনিয়োগ এফডিআই হিসেবে গণ্য হলেও বাস্তবে তা উৎপাদন, প্রযুক্তি উন্নয়ন বা কর্মসংস্থানে তেমন ভূমিকা রাখছে না। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘ছদ্ম এফডিআই’।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে উদ্বেগ আরো স্পষ্ট। গবেষণায় দেখা গেছে, পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য খাতে আসা উল্লেখযোগ্য অংশের বিদেশী বিনিয়োগ মূলত বাজার সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে নতুন মূলধনী যন্ত্রপাতি, কারখানা বা উৎপাদন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ খুবই কম। বিদেশী ব্র্যান্ডগুলো দেশের বাজারে প্রবেশ করে আমদানিনির্ভর ব্যবসা বিস্তার করছে, কিন্তু স্থানীয় শিল্প উন্নয়নে তাদের অবদান সীমিত।

অটোমোটিভ খাতে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। দেশে বিক্রি হওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ গাড়ি সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে গাড়ি সংযোজন, যন্ত্রাংশ উৎপাদন কিংবা সহায়ক শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। এই খাতে এফডিআইয়ের উপস্থিতি থাকলেও তা শিল্পায়নের বদলে আমদানিনির্ভর বাজারকে শক্তিশালী করছে।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে এফএমসিজি বা দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের বাজারেও। সাবান, শ্যাম্পু, পানীয়, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অনেক সময় স্থানীয় উৎপাদন ইউনিট স্থাপনের পরিবর্তে বিদেশ থেকে পণ্য এনে বাজারজাত করছে। এর ফলে দেশে প্রযুক্তি স্থানান্তর বা দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের সুযোগ সীমিত থেকে যাচ্ছে।

লজিস্টিকস ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা খাতেও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাড়লেও তারা নিজেরা বড় অবকাঠামো নির্মাণে আগ্রহী নয়। বরং স্থানীয় পরিবহন ও গুদাম ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এতে খাতটির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বাড়ার বদলে বিদেশী কোম্পানির বাজার নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এ ধরনের বিনিয়োগ দেশের শিল্পভিত্তি শক্তিশালী করে না; বরং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন করে তোলে। উৎপাদনমুখী এফডিআই না এলে নতুন কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং রফতানি সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে না।

আরো একটি বড় উদ্বেগ হলো বিনিয়োগের মুনাফা দ্রুত বিদেশে চলে যাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দুই অর্থবছরে মুনাফা প্রত্যাবাসন বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রবণতা তিনগুণের বেশি বেড়েছে। বর্তমানে দেশে আসা বিদেশী বিনিয়োগের প্রায় ৬৪ শতাংশই মুনাফা হিসেবে বিদেশে ফিরে যাচ্ছে, যেখানে আগের এক দশকে এ হার ছিল ২৭ শতাংশের নিচে।

এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ডলার সঙ্কটের এই সময়ে মুনাফা প্রত্যাবাসনের উচ্চ হার অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নীতিনির্ধারকদের মতে, এখন শুধু এফডিআইয়ের পরিমাণ বাড়ানো নয়, এর গুণগত মান নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিদেশী কোম্পানির জন্য ন্যূনতম উৎপাদন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তরের বাধ্যবাধকতা এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের শর্ত নির্ধারণ করা জরুরি। তাদের মতে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি উৎপাদনমুখী অর্থনীতি হওয়ার পরিবর্তে বিদেশী পণ্যের ভোগনির্ভর বাজারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তাই এখনই নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে প্রকৃত শিল্পায়নমুখী বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সময়ের দাবি।