শাহজালাল ইউরিয়া সার কারখানা বন্ধ থাকায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি
দৈনিক প্রায় ১১শত টন ইউরিয়া সার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই সার কারখানায় গড়ে প্রতিদিন ক্ষতি আড়াই কোটি টাকার বেশি।
Printed Edition
- দেশের ৪০০ হিমাগারে তরল অ্যামোনিয়া সঙ্কট
- ২০২৪ সালে দুই দফায় ১২৫ দিন বন্ধ ছিল।
- চলতি বছরের গত ১২ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের এই বৃহত্তম কারখানা
সিলেট নগরীর অনতিদূরে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা সদরে অবস্থিত দেশের অন্যতম বৃহত্তম শাহজালাল ইউরিয়া সার কারখানা গত বছরের মার্চ থেকে চলতি ২০২৫ সালের বর্তমান এপ্রিল পর্যন্ত তিন দফা বন্ধ থাকায় বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালের ১৩ মার্চ যান্ত্রিক ত্রুটি ও গ্যাসসঙ্কটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় শাহজালাল সার কারখানা। এ দফায় কারখানাটি বন্ধ থাকে ১০১ দিন। পরবর্তীতে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর গ্যাসসঙ্কটের কারণে আবার কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে আবার উৎপাদনে যায় সার কারখানা। চলতি বছর ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিন ওভারহোলিং না করায় যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়ে এই সার কারখানা। গত ১২ মার্চ সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ দিনের মাথায় যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে উঠলেও অদ্যাবধি সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তিন দফা উৎপাদন বন্ধ থাকায় সার কারখানায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ শ’ কোটি টাকা।
সার কারখানার জিএম (অ্যাডমিন) এটিএম বাকি গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ‘দেশে গ্যাসসঙ্কটের কারণে শাহজালাল ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরিতে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেট্রোবাংলার সাথে আলাপ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।’ তিনি জানান, ‘গ্যাসসঙ্কটের সমাধান না হলে খুব সহসা উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।’
জানা গেছে, শাহজালাল সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পেট্রোবাংলার সাথে আলাপ আলোচনার জন্য ঢাকায় অবস্থান করেছেন। সার কারখানার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, দৈনিক প্রায় ১১শত টন ইউরিয়া সার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই সার কারখানায় গড়ে প্রতিদিন ক্ষতি আড়াই কোটি টাকার বেশি। সেই হিসেবে তিন দফা বন্ধের কারণে শাহজালাল সার কারখানায় ক্ষতি হয় প্রায় পাঁচ শ’ কোটি টাকা। এদিকে, শাহজালাল সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় দেশের চার শ’টি হিমাগারে তরল অ্যামোনিয়া সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশের হিমাগার পরিচালনার প্রধান কেমিক্যাল তরল অ্যামোনিয়া গ্যাস সংগ্রহ করা হতো শাহজালাল সার কারখানা থেকে। দেশে প্রায় চার শ’ হিমাগার রয়েছে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের বর্তমান মৌসুমে তরল অ্যামোনিয়া সঙ্কটে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো: মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু নয়া দিগন্তকে জানান, কৃষিপণ্য বিশেষ করে আলু সংরক্ষণের এই মৌসুমে দেশে প্রায় চার শ’ হিমাগারে আলু সংরক্ষণের কার্যক্রম চলছে। ধারণক্ষমতার ৪৫ লাখ মেট্রিক টন আলু এবার সংরক্ষণ করার সম্ভাবনা থাকলেও হিমাগার পরিচালনার প্রধান উপাদান তরল অ্যামোনিয়ার সঙ্কটে সংশ্লিষ্ট সবাই উদ্বিগ্ন। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ শাহজালাল সার কারখানা থেকে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু সময়মতো পর্যাপ্ত অ্যামোনিয়া না পাওয়ায় হিমাগার পরিচালনায় সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বরাত দিয়ে সভাপতি জানান, গত বছরের তুলনায় এবার আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। দেশে আলুর চাহিদা ৯০ লাখ মেট্রিক টন হলেও এ বছর আলুর উৎপাদন হয়েছে এক কোটি ২৭ লাখ মেট্রিক টন। হিমাগার পরিচালনায় তরল অ্যামোনিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই বর্তমানে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় রয়েছেন বলে তিনি জানান। কুমিল্লা জেলার আল হেলাল কোল্ড স্টোরেজের স্বত্বাধিকারী ফারুক আহমদ নয়া দিগন্তকে জানান, কোল্ড স্টোরেজগুলোতে আলু, পেঁয়াজ, আদা, মাছ, ফলমূলসহ কৃষিপণ্য রাখা হয়। উন্নয়নশীল দেশে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য সংরক্ষণে সরকারগুলো ভর্তুকি দিলেও বাংলাদেশ এ খাতে কোনো ভর্তুকি দিচ্ছে না। ফলে কোল্ড স্টোরেজগুলো নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে কোনোমতে হিমাগারগুলো টিকিয়ে রেখেছে।
জানা গেছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ছয়টি বৃহৎ ইউরিয়া সার কারখানায় হিমাগারের এই অ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপাদন হয়। শাহজালাল সার কারখানার টেকনিক্যাল বিভাগ জানায়, তরল অ্যামোনিয়া হচ্ছে ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া সারের মধ্যবর্তী একটি প্রোডাক্ট। ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়ার মূল কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস (মিথেন) বাতাস ও পানি। দেশের অন্যান্য ইউরিয়া সার কারখানায় হিমাগার ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত তরল অ্যামোনিয়া উৎপাদন হতো কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গ্যাস সঙ্কটজনিত কারণে দেশের অন্যান্য পাঁচটি সার কারখানা বন্ধ রাখা হয়। এ ক্ষেত্রে সিলেটের শাহজালাল সার কারখানাও গ্যাসসঙ্কটে কিছুদিন বন্ধ রাখলেও বিগত বছর থেকে সিলেটের এই সার কারখানাকে চালু রাখা হয়। কিন্তু পরবর্তী তিন দফায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ায় তরল অ্যামোনিয়া সঙ্কট দেখা দেয়।
ফেঞ্চুগঞ্জে নবনির্মিত শাহজালাল সার কারখানায় উৎপাদন শুরু হয় ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে। দৈনিক ১৭৬০ মেট্রিক টন দানাদার ইউরিয়া ও ১০০০ মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে চায়নার মেসার্স কমপ্লান্ট ফেঞ্চুগঞ্জে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড নামে এই সার কারখানা স্থাপন করে। এতে ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। শাহজালাল সার কারখানা থেকে বিসিআইসির এনলিস্টেড ৭৯ জন ডিলার দেশের হিমাগার ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়মিত তরল অ্যামোনিয়া সংগ্রহ করতেন। বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তরল অ্যামোনিয়া সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। শাহজালাল সার কারখানায় পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার দু’টি অ্যামোনিয়ার রিজার্ভ ট্যাংক রয়েছে। অ্যামোনিয়া থেকেই ইউরিয়া সার তৈরি করা হয়।
জানা গেছে, নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ফেঞ্চুগঞ্জ শাহজালাল সার কারখানায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয় ২০১৬ সালের ৬ মার্চ। যাত্রা শুরুর পর থেকে আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ এ সার কারখানার উৎপাদন আশার সঞ্চার করে। সূত্র জানায়, করোনাকালীন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সার কারখানার শ্রমিক কর্মকর্তা কর্মচারীসহ সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ওই সার কারখানায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়। দৈনিক ১৭৬০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যে এটি স্থাপিত হলেও ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার উৎপাদন। চলতি মার্চ মাসের ১১ তারিখ উৎপাদন হয় এক হাজার টন সার। এর পরদিন ১২ মার্চ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায় যা আজ অবধি অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত গড়ে দৈনিক হাজার টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল সার কারখানার উৎপাদন। উৎপাদন হ্রাসের জন্য সময়মতো ওভারহোলিং (পুনঃসংস্কার) না হওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে।
শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আশরাফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে ওভারহোলিংয়ের জন্য বারবার জানানো হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিলম্ব হয় সংস্কারকাজ। চলতি বছরে ওভারহোলিংয়ের কাজ অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে গ্যাসসঙ্কটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
শাহজালাল সার কারখানার উৎপাদন বিভাগ জানায়, চলতি অর্থবছর ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় তিন লাখ ৮০ হাজার টন। গত জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চের ১১ তারিখ পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৯০ হাজার ২০৪ টন সার। আমেরিকা ও ন্যাদারল্যান্ডসের প্রযুক্তিতে চায়নার মেসার্স কমপ্লান্ট শাহজালাল সার কারখানা নির্মাণ করে। ২০১২ সালের ২৪ মার্চ নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ৪৪ মাসে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। ফেঞ্চুগঞ্জ পুরনো সার কারখানার পাশে ৬৭ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় অত্যাধুনিক শাহজালাল সার কারখানা।