সংসদে অর্থবিল পাস
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
- ব্যাংক রেজুলিউশন আইনের বিতর্কিত ধারা বিলোপের সিদ্ধান্ত
- পুঁজিবাজারে কর ছাড়ের ঘোষণা
- ৬০ পণ্যে উৎসে কর হ্রাস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় ২০২৬ সালের অর্থবিলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এনে জাতীয় সংসদে তা পাস করা হয়েছে। সংশোধনীর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা প্রস্তাবিত তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা নির্ধারণ। একই সাথে ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব, জমি-ফ্ল্যাটের বণ্টননামা, দলিল নিবন্ধন ও নামজারিতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিধান এবং বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত আলোচিত-সমালোচিত প্রস্তাবগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার বিকেলে জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে কণ্ঠভোটে অর্থবিল-২০২৬ পাস হয়। এর আগে বাজেটের ওপর আলোচনায় বক্তব্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান করমুক্ত আয়সীমা আরো বাড়ানোসহ কয়েকটি প্রস্তাবে সংশোধনী আনার নির্দেশনা দেন। পরে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংশোধনী উত্থাপন করলে তা সংসদে গৃহীত হয়।
সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা হবে চার লাখ টাকা। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরে তা বাড়িয়ে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে পাঁচ লাখ টাকা করা হবে। এর আগে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথম দুই অর্থবছরের জন্য যথাক্রমে তিন লাখ ৭৫ হাজার ও চার লাখ টাকা এবং পরবর্তী সময়ের জন্য চার লাখ ৫০ হাজার টাকা করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল।
অর্থমন্ত্রী জানান, প্রকৃত বাজারমূল্যের পরিবর্তে মৌজা মূল্যে জমি নিবন্ধনের কারণে করদাতাদের জটিলতা দূর করতে বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত বিশেষ বিধান আনা হয়েছিল। তবে এটি কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, এমন সমালোচনা এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় সরকার জনমতের প্রতি সম্মান জানিয়ে পুরো প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করেছে।
একই সাথে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব এবং সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় জমি-ফ্ল্যাটের বণ্টননামা, দলিল নিবন্ধন ও নামজারির জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিধানও প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে আগের মতো টিআইএন ছাড়াই ব্যাংক হিসাব খোলা এবং এসব নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করা যাবে।
অর্থবিলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আয়কর হার বিদ্যমান ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পার্বত্য তিন জেলা ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান কর-সুবিধা সম্প্রসারণ করে ব্যবসা, কৃষি, অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আয় এবং বেতনভিত্তিক আয়ও করমুক্ত রাখার প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
ডিজিটাল অর্থপ্রদানকে উৎসাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের ওপর প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। সরকারের আশা, এতে বিদেশে অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রদান কমবে এবং কর পরিপালন বাড়বে।
স্বর্ণ, প্লাটিনাম ও হীরার অলঙ্কারের ওপর ভ্যাট দুই হাজার ৫০০ টাকা এবং রুপার অলঙ্কারের ওপর ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সাথে এসব অলঙ্কার কেনার ক্ষেত্রে ৫০ পয়সা হারে উৎসে কর কাটার বিধান যুক্ত হয়েছে।
মাছ সরবরাহকারী পর্যায়ে সব ধরনের মাছের ওপর ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সাথে রাজস্ব ভাগাভাগি চুক্তির ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাটও অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
চিংড়িশিল্পকে সহায়তা দিতে আমদানি করা চিংড়ির খাদ্য, প্রোবায়োটিক, ভিটামিন, খনিজ, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়া ওষুধশিল্প, বৈদ্যুতিক কেবল, পিভিসি ও পিইটি রেজিন, পরিশোধিত তামা, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম, ফায়ার ডোর তৈরির কাঁচামাল, কোটেড ক্রোমিয়াম অক্সাইড, ফায়ার ব্রিক, অপরিশোধিত কাজুবাদামসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানো বা প্রত্যাহারের প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ওষুধ ও অন্যান্য উৎপাদন শিল্পে ব্যবহৃত আমদানি করা মধুর ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্কও তুলে নেয়া হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এলইডি বাতি ও প্রিফ্যাব্রিকেটেড ভবনের কাঁচামাল আমদানির বিদ্যমান শুল্ক-সুবিধার মেয়াদ ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। একই সাথে দেশীয় মোটরগাড়ি শিল্পকে উৎসাহ দিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডাবল কেবিন পিকআপ ও মাইক্রোবাসের ওপর ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি কর-পরবর্তী নিট মুনাফার ৩০ শতাংশের কম লভ্যাংশ বিতরণ করলে ঘাটতির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। তবে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ বিধানের বাইরে থাকবে।
নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মূলধন বা বার্ষিক বিক্রয় রয়েছে- এমন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিসংঘের জন্য নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, মোবাইল আর্থিক সেবার মার্চেন্ট হিসাব এবং প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিদেশ থেকে সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায়ের দায়িত্ব ব্যাংক ও অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। প্রতি তিন কর মেয়াদ শেষে একবার রিটার্ন দাখিলের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির জন্য আলাদা সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া যৌথ উন্নয়ন চুক্তির আওতায় জমির মালিক ডেভেলপারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ বা অন্য সুবিধা পেলে সেটিকে মূলধনী প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য করে কর আরোপের বিধান রাখা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থবিলে আনা এসব সংশোধনী জনমত, ব্যবসা-বাণিজ্যের বাস্তবতা এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় করা হয়েছে। এতে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং শিল্প উৎপাদনে গতি আসবে বলে সরকার আশা করছে।