হামে আরো ৭ মৃত্যু : উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ৮৬০ শিশু
বাংলাদেশ এখন হামের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ : হু
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
হাম আক্রান্ত ও উপসর্গে আরো সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এর আগের ২৪ ঘণ্টায়। এর মধ্যে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে এবং উপসর্গ নিয়ে মারা যায় অন্য চার শিশু। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত হামে সারা দেশে ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে। গতকাল বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর বলেছে, উল্লেখিত সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৯৮ শিশুর। এ ছাড়া একই সময়ের মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়েছে ১৭২ শিশু। অন্য দিকে গতকাল সকাল পর্যন্ত হাসপাতালগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৮৬০ শিশু।
গতকাল সকালের পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে যে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে তার ছয়জনই ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে মারা গেছে। অন্য শিশুটির মৃত্যু হয়েছে সিলেট বিভাগের হাসপাতালে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর বলেছে, ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে এক হাজার ২১৫টি শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা যায়। এদের মধ্যে ৮৬০ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের ৩৬৩ শিশুই ঢাকা বিভাগের হাসপাতালে। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৭৯৯টি শিশু গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিভাগের ৩৭৩ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা গেছে মোট ২৯ হাজার ৫৪৯ শিশুর। এদের থেকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৯ হাজার ৭০৫ শিশু। এদের ৪ হাজার ২৩১ শিশুর হাম শনাক্ত হয়। আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া শিশু সংখ্যা ১৬ হাজার ৫২৭।
এ দিকে গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. ক্যাথারিন বোহেমে বলেন, টিকার উচ্চ কাভারেজ থাকা সত্ত্বেও সামান্য ঘাটতি রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে, বাংলাদেশের চলমান হামের পরিস্থিতি এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। তিনি গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, টিকা আমাদের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী ও ব্যয় সাশ্রয়ী বিনিয়োগগুলোর একটি। তিনি বলেন, এর সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে টিকা যেন সর্বত্র সব মানুষের কাছে পৌঁছে তা নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওই কর্মকর্তা বলেন, সরকার অংশীদারদের সহায়তায় দেশব্যাপী হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করছে, যার লক্ষ্য ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ৩০ হাজার শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা। এর মধ্যে কক্সবাজারে রয়েছে এক লাখ ৮২ হাজার ২৭০ শিশু রয়েছে। ড. বোহেমে বলেন, এটি বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও নাজুক পরিবেশে সব শিশুকে সময়মতো জীবনরক্ষাকারী টিকা নিশ্চিত করার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
চুয়াডাঙ্গায় প্রথম মৃত্যু
দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, চুয়াডাঙ্গায় প্রথমবারের মতো হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত শিশু হুমাইরা খাতুন মাখালডাঙ্গা ইউনিয়নের দীননাথপুর গ্রামের নিমতলাপাড়ার বাসিন্দা হুমায়ুন ইকবাল আহমেদের কন্যা।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: নাজমুস সাকিব বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জেলায় এটাই প্রথম হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা। তিনি আরো বলেন, শিশুটির নমুনা ঢাকায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলে তা পজিটিভ আসে, অর্থাৎ নিশ্চিতভাবে হাম রোগেই আক্রান্ত ছিল সে।
এ দিকে এই ঘটনার পর নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে জেলায় হাম সংক্রমণ নিয়ে। বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো পাঁচজন রোগী ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৫০ জন রোগী হাম আক্রান্ত অথবা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
ময়মনসিংহ মেডিক্যালে নতুন ভর্তি ৪৭ শিশু
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত থাকায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ৪৭ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭ জনে।
শুক্রবার দুপুরে হাসপাতালের হাম মেডিক্যাল দলের ফোকাল পারসন সহযোগী অধ্যাপক ডা: মোহা: গোলাম মাওলা এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গত ১৭ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৭৯৫ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে আরো ৩৫ শিশু। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৭০২ শিশু। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এই সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ১৬ শিশু।
মুন্সীগঞ্জে ৩ কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এ ঘোষণা দেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দেশে হামের টিকা নিয়ে বড় ধরনের কোনো সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হয়নি। এর ফলে বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে সরকার ইতোমধ্যে সারা দেশে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পরিদর্শনকালে দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের অভিযোগে মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জনসহ তিন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন মন্ত্রী। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেলার স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।