শেরপুরে নিহত জামায়াত নেতার দাফন সম্পন্ন
ইউএনও ও ওসি প্রত্যাহার
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা ও শেরপুর প্রতিনিধি
ঝিনাইগাতী উপজেলার ইউএনও এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করা হয়েছে। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যার পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে এটি করা হয়েছে। বাকি প্রসিডিউরগুলো চলমান আছে বলে এ তথ্য জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনে গতকাল গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে ইসি সচিব বলেন, শেরপুরে একটি ঘটনা ঘটেছে যেটা খুবই নিন্দনীয়। আমাদের আচরণবিধিতে একটা বিধান রাখা হয়েছে যে, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে প্রচার-প্রচারণা করতে হবে।
সরকারের উদ্বেগ : জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে
শেরপুরে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে অন্তর্বর্তী সরকার। একই সাথে এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানিয়েছে। গতকাল সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে দেয়া এক বিবৃতিতে জামায়াত নেতার মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ অন্তর্বতী সরকার জানায়, সহিংসতার ফলে প্রাণহানি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং দুঃখজনক। জাতীয় নির্বাচন আর মাত্র দুই সপ্তাহ দূরে থাকাকালে সরকার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামসহ সব রাজনৈতিক দলের প্রতি দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রদর্শন এবং তাদের সমর্থকদের মধ্যে সংযম নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণহানির কোনো স্থান নেই।
বিবৃতি আরো বলা হয়, শেরপুরে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনার সাথে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। একই সাথে জেলার সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার জানায়, সব রাজনৈতিক দল, নেতা ও নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত সবার প্রতি শান্তি বজায় রাখা, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক উপায়ে ভোটারদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। শান্ত পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক আচরণের ওপরই জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল।
অন্তর্বর্তী সরকার একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপ প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় জামায়াত নেতার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সরকার পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানান। তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের বিভিন্ন ফুটেজ বিশ্লেষণ করে গ্রেফতারের কাজ করছে পুলিশ। সে সাথে নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়েও সরকার সতর্ক রয়েছে।
আজাদ মজুমদার বলেন, শেরপুরে জামায়াত নেতা হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করতে পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পরিবার মামলা দায়ের না করলে পুলিশ বাদি হয়ে মামলা করবে। তবে ঢালাও অভিযান না চালিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পুলিশ তদন্ত করছে।
শ্রীবরদীতে জামায়াত নেতার জানাজায় মানুষের ঢল
শেরপুর প্রতিনিধি জানান, শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও ফতেহপুর ফাজিল মাদরাসার আরবি প্রভাষক মাওলানা রেজাউল করিমের জানাজায় হাজার হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শোক, শ্রদ্ধা আর আবেগে পুরো এলাকা যেন থমকে যায়। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে আগত মুসুল্লি, দলীয় নেতাকর্মী, আলেম ওলামা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ তাদের প্রিয় এই মানুষকে শেষ বিদায় জানাতে এ জানাজায় অংশ নেন। জানাজায় ইমামতি করেন দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সামিউল হক ফারুকী।
গতকাল বিকেলে শ্রীবরদী সরকারি কলেজ মাঠে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জানাজার মাঠজুড়ে মানুষের ঢল নামে। সন্ত্রাসীদের হাতে তাদের প্রিয় ভাইয়ের এভাবে চলে যাওয়াকে তারা যেন কোনোভাবেই মানতে পারছিলেন না। জানাজায় এসে তাদের প্রিয় ভাইকে হারিয়ে অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ জামায়াতের আমির মাওলানা আবদুল করিম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য অ্যাডভোকেট নাজমুল হক সাঈদী, শেরপুর-১ (সদর) আসনে জামায়াতের প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া ভিপি, শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল, শেরপুর জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান, এনসিপির জেলা সমন্বয়কারী ইঞ্জিনিয়ার মো: লিখন মিয়া, খেলাফত মজলিসের সভাপতি মাওলানা আবদুল হালিম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ সম্পাদক ইউসুফ ইসলাহীসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা।
জানাজা-পূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বক্তারা মরহুম মাওলানা রেজাউল করিমের দ্বীনি, শিক্ষামূলক ও সামাজিক অবদান গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তারা বলেন, তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান সংগঠক, আদর্শ শিক্ষক ও নিরহঙ্কারী সমাজসেবক। দাওয়াহ ও সংগঠনের কাজে তিনি আজীবন সক্রিয় ছিলেন এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়েছেন। বক্তারা আরো বলেন, তার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো এলাকার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এ সময় বক্তারা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি জানান।
রাত সাড়ে ৮টায় মরহুমের নিজ গ্রাম গোপালখিলা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। দ্বিতীয় জানাজায়ও গ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষসহ আশপাশের এলাকার মুসল্লিরা অংশ নেন। জানাজা শেষে বিশেষ দোয়া ও মুনাজাত পরিচালনা করা হয়। এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মাওলানা রেজাউল করিমের এ ঘটনাকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরাসরি ‘হত্যাকান্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে দোষীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানায়। একই সাথে নিহতের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়।
এ দিকে ঘটনার পর থেকে ঝিনাইগাতী ও আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। স্থানীয় মানুষ দ্রুত ঘটনার ন্যায়বিচার এবং স্থায়ী শান্তি কামনা করছেন।
নামাজে জানাজার আগে শ্রীবরদী উপজেলা সদরে জামায়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের প্রধান নির্বাচনী কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ড. ছামিউল হক ফারুকী। তিনি অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
শেরপুর জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান জানান, এ ঘটনায় আজ শুক্রবার দুপুরে জেলা শহরে এক বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
শেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো: মিজানুর রহমান ভূঞা বলেন, বর্তমানে ঝিনাইগাতীসহ জেলার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বুধবার বিকেলে ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদ মাঠে প্রশাসন আয়োজিত নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বাগি¦তণ্ডা থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এ ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। সংঘর্ষে গুরুতর আহত মাওলানা রেজাউল করিমকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মারা যান।
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে নিহত জামায়াত নেতা মাওলানা রেজাউল করিমের লাশ বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পুলিশ জানায়, নিহতের মাথার পেছনে থেঁতলানো জখমসহ কপাল ও নাকে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানানো হয়েছে, আঘাতজনিত কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইগাতীতে সঙ্ঘাতের ঘটনায় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে মোট তিনজন রোগী ভর্তি আছেন। এর মধ্যে জামায়াতের দু’জন ও বিএনপির একজন নেতা। তারা হলেন- শ্রীবরদী পৌর জামায়াতের আমির মো: তাহেরুন ইসলাম ও জামায়াতের কর্মী আমিরুল ইসলাম এবং মো: সুজাউদ্দৌলা নামের ঝিনাইগাতীর একটি ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনজনের শরীরে ইটের আঘাত আছে।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মাঈনউদ্দিন খান জানান, এ ঘটনায় আহত তিনজন বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একজনের মাথায় আঘাত থাকায় তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।