ইহুদিবিদ্বেষের সংজ্ঞা যেভাবে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে

Printed Edition

আনাদোলু এজেন্সি বিশ্লেষণ

ইহুদিবিদ্বেষের সংজ্ঞা ব্যবহার করে ইসরাইলের সমালোচনা দমন করা হচ্ছে- এ মর্মে সম্প্রতি এক বিশ্লেষণে বিষয়টি সামনে এনেছেন সাংবাদিক বেলকিস কিলিচকায়া। তার মতে, ইসরাইলের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকে ‘ইহুদিবিদ্বেষ’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা পশ্চিমা বিশ্বে ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। বিশ্লেষণে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে একাডেমিয়া, গণমাধ্যম, রাজনীতি কিংবা করপোরেট অঙ্গনে ইসরাইলের কঠোর সমালোচনা করলেই অনেক ক্ষেত্রে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ আনা হয়। এমনকি সমালোচক ব্যক্তি নিজে ইহুদি হলেও বা হলোকাস্ট গবেষণায় যুক্ত থাকলেও এ অভিযোগ থেকে রেহাই মিলছে না। অনেক দেশে বিষয়টি শুধু সামাজিক অপবাদ নয়, বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক হলোকাস্ট স্মরণ জোটের (আইএইসআরএ) সংজ্ঞাকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ২০০০ সালে প্রণীত এই সংজ্ঞা ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ২০১৭ সালে গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও আদালতে এটি কার্যত নির্দেশিকা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এই সংজ্ঞার বহু ধারা সরাসরি ইসরাইল রাষ্ট্রকে ঘিরে, যা রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে সমালোচনাকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। আইএইসআরএ-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ইসরাইলের অস্তিত্বকে ‘বর্ণবাদী উদ্যোগ’ বলা, অন্য রাষ্ট্রের চেয়ে ইসরাইলের ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগের অভিযোগ তোলা, কিংবা ইসরাইলি নীতির সাথে নাৎসি জার্মানির তুলনা করাকেও ইহুদিবিদ্বেষ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এর ফলে ফিলিস্তিনে দখল, বসতি স্থাপন, সামরিক অভিযান কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনাও বিতর্কিত হয়ে উঠছে।

পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল ও সহিংসতার ঘটনাকে অনেক সময় ‘দখলদারি’ না বলে ‘বসতি স্থাপন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একাধিক গবেষক ও সাংবাদিক এই ভাষাগত কাঠামোর সমালোচনা করায় চাকরি হারান। অনেকে একাডেমিক পদচ্যুতি কিংবা আইনি চাপে পড়েছেন। ফিলিস্তিনি অধিকারের পক্ষে বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা (বিডিএস) আন্দোলনকেও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ আখ্যা দিয়ে সীমিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পরিসরে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও দেখা যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে লাখো মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। অনেক ইহুদি শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীও এই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে ইহুদিবিদ্বেষের সংজ্ঞার অপব্যবহারের বিরোধিতা করছেন।

সম্প্রতি ফ্রান্স ও ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। বর্তমানে জাতিসঙ্ঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ১৫০টির বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় চলমান মানবিক সঙ্কট ও যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও এই বিতর্ক থামছেই না। তাদের মতে ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সমালোচনা দমন করা হলে সত্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।