৪ মাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে ডিএসই সূচক
৮২ শতাংশের বেশি কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
হঠাৎ উল্লম্ফন ঘটেছে পুঁজিবাজার সূচকের। সোমবার সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। এর আগে দুই দিন বাজার অনেকটা গতিহীন থাকলেও গতকাল হঠাৎ বাজার পরিস্থিতি পাল্টে যায়। এক দিন আগে বাজার সংশ্লিষ্টরা নেতিবাচক প্রবণতার কারণ হিসেবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মাঝে অস্বস্তির কথা বললেও গতকালের বাজার আচরণ তা ভুল প্রমাণ করল। লেনদেনের শুরু থেকেই সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দিনশেষে পুঁজিবাজার সূচককে বিগত চার মাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে দেয় গতকাল।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্সে গতকাল ৮২ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। এ দিন সকালে ৫ হাজার ২২৯ দশমিক ০৮ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩১১ দশমিক ৯৪ পয়েন্টে। আর এভাবে সূচকটি পৌঁছে যায় বিগত চার মাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে। গত বছরের ৮ অক্টোবরের পর ডিএসইর প্রধান সূচকটি আর এ অবস্থানে পৌঁছেনি। সকালে লেনদেন শুরুর পর থেকে বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়াই সাবলীল গতিতে এগিয়ে যায়। বেলা ১১টা অর্থাৎ লেনদেনের প্রথম এক ঘণ্টায় সূচকটি পৌঁছে যায় ৫ হাজার ২৯০ পয়েন্টে। এ সময় সূচকটির উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ৬০ পয়েন্ট। লেনদেনের এ পর্যয়ে মৃদু বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে সূচকটি কিছুটা নিম্নমুখী আচরণ করলেও বেলা ১টা পর্যন্ত ৪৬ পয়েন্টে বেশি উন্নতি ধরে রাখে। বেলা ১টার পর নতুনভাবে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে, যা দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৩১১ দশমিক ৯৪ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়ার উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩৩ দশমিক ১৭ ও ১১ দশমিক ৮১ পয়েন্ট।
অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১০৯ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ১৪ হাজার ৬৮৩ দশমিক ০২ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে ১৪ হাজর ৭৯২ দশমিক ৮৮ পয়েন্টে স্থির হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৭২ দশমিক ৪৫ ও ৫৬ দশমিক ৮১ পয়েন্ট।
দিনের বাজার আচরণ নিয়ে বাজারের স্টেক হোল্ডাররা খুব একটা মন্তব্য করতে রাজি হননি। কারণ তারা মনে করেন বিনিয়োগকারীরা কখন কোন সিদ্ধান্ত নেবেন, তা কেউ বলতে পারেন না। এমনও ঘটনা ঘটে, সকালে লেনদেন শুরুর আগে বাজার নিয়ে যে ধারণা করা হয় লেনদেন শুরু হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তার উল্টোটাই ঘটে। তবে বাজার আচরণ নিয়ে গতকাল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা যায়। তারা মনে করছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে গত দুই দিন ধরে যে অস্বস্তি বিরাজ করছিল তা থেকে অনেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাদের ধারণা, ক’দিন পরই নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে। বাজারে নতুন নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন ঘটলে আবার স্বাভাবিক আচরণ শুরু করবে পুঁজিবাজার। এ ধারণা থেকে অনেকে বাজারে অবস্থান নিচ্ছেন। তবে এর মধ্যেও তারা লাগামহীন আচরণ করেননি। সূচকের উন্নতির তুলনায় লেনদেন তেমন একটা গতি পায়নি। কারণ বিনিয়োগকারীরা ছিলেন বেশ সতর্ক।
এ দিকে দিনের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা বরাবরের মতো সূচকের উন্নতির পেছনে গতকালও ব্যাংক, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাতের অবদানই ছিল বেশি। এ তিনটি খাতের ৯০ শতাংশের বেশি কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। পাশাপাশি গ্রামীণফোনের মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকাও সূচকে ছিল। আবার কয়েকটি খাতে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে শতভাগ কোম্পানির। কিন্তু স্বল্প মূলধনী হওয়ার কারণে সূচকের উন্নতিতে এগুলোর খুব একটা অবদান থাকেনা। তবে মৌলভিত্তির দিক থেকে এগিয়ে থাকা কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগই গতকাল মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নেয়। এভাবে গতকাল ডিএসইর লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানির মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নেয় ৮২ শতাংশের বেশি কোম্পানি ও ফান্ড। বাজারটিতে লেনদেন হওয়া ৩৯৭টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩২৭টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২৭টি। অপরিবর্তিত ছিল ৩৩টির দর। অন্য দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ১৯২টি সিকিউরিটিজের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে ১৩০টির। এখানে ৪১টি সিকিউরিটিজের দাম করে এবং ২১টির দর অপরিবর্তিত থাকে।
ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে ছিল টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ। ২০ কোটি ৬২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৮৫ লাখ ৭ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় ২৮ লাখ ৩৫ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ঢাকা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, ব্র্যাক ব্যাংক, ফাইন ফুডস, মুন্নু ফেব্রিক্স, সায়হাম টেক্সটাইলস ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।
ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। ৮ দশুমিক ৮৮ শতাংশ মূল্যবৃুদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল এ বি ব্যাংক। গতকাল মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে লঙ্কা-বাংলা ফিন্যান্স, আইএফআইসি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ইউনাইটেড ফিন্যান্স, এপেক্স স্পিনিং, এআইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।
ডিএসএিত গতকাল দরপতনের শীর্ষে ছিল ইসলামী ব্যাংক। ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ দর হারায় ব্যাংকিং খাতের কোম্পানিটি। ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। দরপতনে ডিএসই’র শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এ্যলআর গ্লোবাল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, স্ট্যান্ডার্ড সিরামিকস, আরএসআরএম স্টিলস, জি কিউ বলপেন, প্যাসিফিক ডেনিমস, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর ও এমারেল্ড অয়েল।