শেষ মুহূর্তে আলোচনার নামে যে সময় ক্ষেপণ করার কৌশল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গ্রহণ করেছিল, তা প্রমাণিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের ওপর আচমকা সামরিক অভিযান শুরুর মধ্য দিয়ে
মার্চে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা : আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
Printed Edition
রাজনৈতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনো দেশ ও জাতির স্বাধীনতা এমন একটি অবস্থা, যেখানে একটি ভূখ-ের জনগণ অথবা এর একটি অংশ পরনির্ভরশীলতা, শোষণ, নিপীড়ন মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে নিজস্ব সরকার ও সেই ভূখ-ের ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হওয়া এবং অন্য কোনো দেশ বা জাতির হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজস্ব দেশ ও জাতি গঠন করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না। বাংলাদেশ ভূখ-কে স্বাধীন সত্তায় আত্মপ্রকাশের সকল কার্যকারণ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের শাসনে। দু:শাসনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের ফলশ্রুতি ছিল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো বিপ্লব ছিল না, বরং বৈধ অধিকার ছিল, যা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে অর্জিত হতে পারতো, যেমনটি হয়েছিল ব্রিটিশের হাত থেকে ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা আদায় করার ক্ষেত্রে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকরা আলোচনার পথ গ্রহণের পরিবর্তে স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র বাংলাদেশি জনগণের ওপর নজীরবিহীন বলপ্রয়োগ করে একটি অবাঞ্ছিত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। এছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না বাঙালির।
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের বৈধ উপায় হিসেবে সহিংসতার প্রশ্নে বিশ্বজুড়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। সাধারণভাবে বিপ্লবের লক্ষ্য কেবল একটি দেশের মধ্যে ক্ষমতাসীন শাসকের দু:শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সরকার বিরোধী প্রধান দল বা সম্মিলিতভাবে বিরোধী দলের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন, এমনকি সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সকল বিভাগের গণতন্ত্রীকরণ ইত্যাদি। বিপ্লবও সশস্ত্র হতে পারে এবং বাংলাদেশেও গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসের আন্দোলনকে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ জনগণকে এতটাই ক্ষুব্ধ করেছিল যে তারা সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটে যেতে বাধ্য করেছিল। অবিভক্ত পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণ গণতন্ত্র ও স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিতে আন্দোলন করেছে, যা শাসকগোষ্ঠী বার বার বলপ্রয়োগ করে দমন করেছে। কিন্তু এই ভূখ-ের অধিবাসীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। পাকিস্তানের ক্ষমতার মূল কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের ভূখ-গত বিচ্ছিন্নতা স্বাধীনতাকামী অন্য যেকোনো জাতির চেয়ে বাংলাদেশিদের জন্য অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি করে রেখেছিল। তাছাড়া পাকিস্তান এমন কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র ছিল না যে, দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত একটি ভূখ-কে দীর্ঘদিনের জন্য উপনিবেশ হিসেবে শাসন ও শোষণ করতে পারবে। কিন্তু যা হওয়ার ছিল না, সেই অসাধ্য সাধন করার অপচেষ্টা করে পাকিস্তান স্বয়ং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করেছে বললে ভুল হবে না।
যেকোনো যুদ্ধের অনিবার্য উপসর্গ জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, সেক্ষেত্রেও জুলুমের সকল সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। নির্বিচার হত্যা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণের ঘটনা আন্তর্জাতিক বিশ্বও সহজে মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করার পর পাকিস্তানের কূটনৈতিক আপত্তি সত্ত্বেও বিশ্বের বহু দেশ বাংলাদেশকে দ্রুত আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অনুপস্থিতিতে স্বাধীনতামী বা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত জাতি, অস্থায়ী সরকার ও মুক্তিবাহিনী হতাশ হয়ে পড়ে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ প্রলম্বিত হয়, জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপানিদের হাতে বন্দী ব্রিটিশ বাহিনীর ভারতীয় সৈনিকদের নিয়ে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস গঠন করেছিলেন ‘আজাদ হিন্দ সরকার,’ ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’। আজাদ হিন্দ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে নিজস্ব মুদ্রা চালু করেছিলেন, পৃথক ডাকটিকেট মুদ্রণ করার ব্যবস্থা করেছিলেন। জার্মানি, জাপান, ইটালি, বার্মা, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ স্বীকৃতিও দিয়েছিল, ভারত তখন স্বাধীন হতে পারেনি মিত্রশক্তি যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনী যদি মুক্তিবাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হতো এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করতো, তাহলে কোনো রাষ্ট্র বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দিলেও সহজে স্বাধীনতা আসতো না। অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধ চলতে থাকতো। জানমালের আরো বেশি ক্ষয়ক্ষতি হতো। বিশ্বের আরো অনেক দেশের ক্ষেত্রে এমন দেখা গেছে যে কোনো ভূখ- স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও অথবা অন্যান্য দেশ আংশিক স্বীকৃতি প্রদান করলেও স্বাধীন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি মুখ্য ছিল, তা হলো এই অঞ্চলের জনগণ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তারা প্রথমে ‘বাঙালি’ এবং শেষপর্যন্ত ‘বাঙালি’ ছিল। স্বাধীনতা অর্জন করা সত্ত্বেও সংবিধান প্রণয়ন প্রশ্নে শাসকগোষ্ঠী এত মন্থর গতিতে অগ্রসর হচ্ছিল যে, এরই মধ্যে পূর্বাঞ্চলের জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষত তরুণ জনগোষ্ঠী পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা শোষণ, বঞ্চনা এবং তাদের কৃত অন্যায়ের গভীর ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠেছিল। আইয়ুব খানের অর্থনৈতিক বাস্তববাদের এক দশককে পশ্চিম পাকিস্তানের তথাকথিত ধনবান বাইশ পরিবারের পক্ষ থেকে উৎসারিত বলে অভিযোগ উঠে, যা বাঙালিদের মাঝে তাদের প্রতি অর্থনৈতিক অবিচারের বোধকে আরো গভীর করে তোলে। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের অধীনে দৃশ্যত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা শাসকের নিরঙ্কুশবাদ বদ্ধ পানিতে নৈরাজ্যবাদের মারাত্মক জীবাণু প্রজননের একটি যুগ ছিল বলে প্রমাণিত হয়েছিল। যেকোনো মূল্যে স্থবিরতা নিশ্চিত করার পদ্ধতি গ্রহণ করার ফলে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হলেও রাজনৈতিকভাবে তা ইতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। পূর্ব পাকিস্তান ক্ষমতার করিডর থেকে দূরে ছিল এবং ক্ষমতা নিহিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছে, যা বাঙালি ক্ষোভ ও উগ্রতার বিকাশে ভূমিকা রেখেছে।
উন্নয়নের লক্ষ্যে যৌথ জাতীয় নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রীয় নীতি নির্ধারকদের ব্যর্থতা পূর্ব পাকিস্তানে সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় পক্ষপাত ও আঞ্চলিকতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে কায়েমি স্বার্থবাদীদের বিকাশ ও অংশীদারত্ব সবকিছুতে ইসলামী আদর্শের নামে এক ধরনের জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়, যা ব্যাপকভাবে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে এবং ইসলাম শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে আর কোনো অর্থ বহন করে না। রাজনীতিতে ইসলামী আদর্শ চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাতের অস্ত্রে পরিণত হয়ে এই আদর্শ বিরোধীর গলা চেপে ধরার মতো এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এটি ছিল রাজনীতি ও আবেগশূন্যতার পরিণতি, যা আইয়ুব খানের শাসনের বছরগুলোতে পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে গভীর মেরুকরণের সৃষ্টি করে। জাতীয় ঐক্য জোরদার করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের জনসংযোগের উদ্যোগ ফলপ্রসূ হওয়া তো দূরের কথা, পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ব্যবধান আরো বৃদ্ধি করে।
পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুব বিরোধিতা দুটি সুনির্দিষ্ট ও পরস্পর বিরোধী রূপ গ্রহণ করেছিল। পূর্বাঞ্চলে এটি টিকে থাকার সংগ্রাম, অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির ঘাঁটি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মুক্তিলাভের সংগ্রাম। অপর দিকে পশ্চিম পাকিস্তানে এটি ছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সাজানো সংগ্রামে, যার কোনো ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেনি। গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব ধারণা ছিল। মুসলিমের কাছে গণতন্ত্র ছিল জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খানের অধীনে পাকিস্তানের প্রাথমিক দিকে ফিরে যাওয়া অর্থাৎ পাঞ্জাবি আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যবাদে প্রত্যাবর্তন। বাংলাদেশের বামপন্থীরা গণতন্ত্রকে ব্যাখ্যা করে প্রলেতারিয়েতদের একনায়কত্ব হিসেবে, যাদের শেকড় প্রোথিত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বা প্রদেশে। ইসলামী দলগুলো খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে ফিরে যাওয়ার পক্ষে ছিল।
পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগের কাছে গণতন্ত্র ছিল প্রধানত বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তি এবং তাদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বাঙালিদের পাকিস্তান, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানকে শাসনের একচ্ছত্র অধিকার। পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টি জনগণকে কিছু চটকদার স্লোগান দিয়ে মুগ্ধ করেছিল : ‘ইসলাম আমাদের ধর্ম’, ‘সমাজতন্ত্র আমাদের অর্থনীতি’, ‘গণতন্ত্র আমাদের উপায়’, ‘সকল ক্ষমতা জনগণের’ - যা দুই ভিন্ন জগতের সেরা তত্ত্বের অদ্ভুত এক মিশ্রণ। পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দল পুরোনো এবং সমস্যায় জরাজীর্ণ, বয়োবৃদ্ধ নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত ছিল, যারা ইতোমধ্যে পরীক্ষিত, জনগণ যাদের প্রত্যাখ্যান করেছিল।
ইয়াহিয়া খানের অধীনে রাজনৈতিক তৎপরতা পুনরুজ্জীবিত করা এবং সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ও নিয়মাবলী ঘোষণা করার পর রাজনৈতিক তৎপরতার পুনরুজ্জীবন এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের কলাকৌশলের বিস্তারিত বিবরণী বাস্তবে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ব্যবধানকে আরো সুস্পষ্ট করে তুলেছিল। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একত্বের প্রতীক হিসেবে শুধু জাতীয় পতাকা ছাড়া আর কোনো কিছুর মিল ছিল না। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে কার্যত কোনো রাজনৈতিক যোগসূত্রই অবশিষ্ট ছিল না। বরং নির্বাচন অনুষ্ঠানের অজুহাতে দেশের দুই অংশের মধ্যে অবিশ্বাস, বিবাদ, চক্রান্ত এবং শোষণের তেইশ বছরের ইতিহাসের অত্যধিক চাপের মধ্যে ছিল ও অতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
পশ্চিম পাকিস্তানিদের সাথে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ব্যবধান তো ছিলই, আধিপত্য ও প্রভুত্ব চাপিয়ে দেয়ার কারণে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানিদের যে বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছিল, তা শুধু পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন অনুমোদন করার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি হওয়ার মতো ছিল না। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার যেখানে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সঙ্কট নিষ্পত্তি হওয়ার কথা, তার পরিবর্তে সামরিক গোষ্ঠী সঙ্কটকে ঘনীভূত করে এবং অনিবার্য সঙ্ঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। শেষ মুহূর্তে আলোচনার নামে যে সময়ক্ষেপণ করার কৌশল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গ্রহণ করেছিল, তা প্রমাণিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের ওপর আচমকা সামরিক অভিযান শুরুর মধ্য দিয়ে। এরপর টানা নয় মাস ধরে যে বর্বরতা চালানো হয়, পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই বর্বরতার একক বা সম্মিলিত প্রতিবাদ করেনি। সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সামান্য কিছু ব্যক্তির প্রতিবাদী কণ্ঠ এত ক্ষীণ ছিল যে, তাতে সামরিক সরকার বা সেনাবাহিনী তাদের আত্মঘাতী পথ পরিবর্তনের প্রয়োজন বোধ করেনি। এর পরিণতি ছিল পাকিস্তানের অপমানজনক সামরিক পরাজয় বরণ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়।