কাজ ছাড়াই বেতন পাচ্ছেন কর্মীরা
লোকসানের কারণে ৬ বছর বন্ধ পাবনা চিনিকল
Printed Edition
এসএম আলাউদ্দিন পাবনা
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়ায় অবস্থিত পাবনা চিনিকল দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকলেও এ সময়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে আট কোটি টাকার বেশি। অন্য দিকে অযতœ-অবহেলায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। মিলটি বন্ধ থাকায় স্থানীয় আখচাষিরাও পড়েছেন চরম সঙ্কটে।
একসময় শ্রমিক-কর্মচারী ও আখচাষিদের পদচারণায় মুখর ছিল চিনিকল এলাকা। এখন সেখানে নীরবতা আর জনশূন্য পরিবেশ। স্থানীয়দের ভাষায়, একসময়ের ব্যস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত স্থাপনায় পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মিলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ৬০ একর জমির ওপর নির্মিত এ চিনিকলের দৈনিক আখমাড়াই সক্ষমতা ছিল প্রায় এক হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। ১৯৯৬-৯৭ মাড়াই মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। পরের মৌসুমে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় কারখানাটি।
তবে শুরু থেকেই লোকসান গুনতে থাকে মিলটি। পরে ২০২০ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় দেশের আরো কয়েকটি চিনিকলের সাথে পাবনা চিনিকলের আখমাড়াই কার্যক্রমও বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকেই মূলত এ অঞ্চলে আখচাষ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে মিলটিতে ২৭ জন স্থায়ী ও ৩০ জন অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১২ লাখ টাকা। বছরে এ ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় দেড় কোটি টাকা। ২০২০ সালে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর গত ছয় বছরে শুধু বেতন বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে আট কোটি টাকার বেশি।
এ ছাড়া মিলের যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা পাহারার দায়িত্বে রয়েছেন ৩০ জন নিরাপত্তাকর্মী। দিনে ও রাতে তিন শিফটে তারা দায়িত্ব পালন করেন। তাদের মাসিক বেতন বাবদ ব্যয় হয় প্রায় পাঁচ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।
একটি সূত্র জানায়, সচল অবস্থায় এখানে প্রায় এক হাজার ২০০ শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে প্রশাসন, কারখানা রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বিভাগে সীমিতসংখ্যক কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় প্রায় ৮০ কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সংস্কার ও মিলে আখ মাড়াইয়ের কাজ চালু না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।
চিনিকল এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, পাবনা চিনিকল দেশের অন্যতম বড় একটি মিল ছিল। এর উৎপাদন সক্ষমতা বেশি এবং চিনির মানও ভালো ছিল। কিন্তু মিলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এ এলাকায় আখচাষ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য ফসলের তুলনায় আখে ভালো লাভ পাওয়া যেত। তাই দ্রুত মিল চালুর দাবি জানান তিনি। আরেক বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, চিনিকল বন্ধ থাকায় বিপুল মূল্যের যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। সরকারের উচিত দ্রুত এটি চালু করা।
পাবনা চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আখতারুজ্জামান বলেন, চিনিকলটি চালু করে শুধু চিনি নয়, অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্যও উৎপাদন করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক করা যেতে পারে। তিনি জানান, বর্তমানে যন্ত্রপাতি রক্ষায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার রয়েছে। কাজেই চুরি হওয়ার সুযোগ নেই।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, উৎপাদন বন্ধ রেখে বছরের পর বছর শুধু বেতন-ভাতা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় বাড়ানোর বদলে কবে আবার চালু হবে পাবনা চিনিকল, সেই উত্তরই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।