মসজিদের বাহ্যিক সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জা প্রসঙ্গে : আলী ওসমান শেফায়েত

Printed Edition

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের ইবাদতের জন্য মসজিদকে মনোনীত করেছেন। মসজিদ হলো আল্লাহর ঘর, যার মূল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে সেখানে মুসল্লিদের উপস্থিতি, কাতারবদ্ধ ইবাদত এবং আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো- বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে মসজিদকে সুসজ্জিত ও জাঁকজমকপূর্ণ করাকে অনেকে ‘ফ্যাশন’ বা প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে মসজিদের বাইরে চতুর্পার্শ্বে মরিচ বাতি বা অতিরিক্ত আলোকসজ্জা করে আভিজাত্য প্রকাশের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে আমাদের সবাইকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করার অনুরোধ করছি :

১. কিয়ামতের আলামত ও অহঙ্কার : আনাস বিন মালেক রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেছেন, ‘ততদিন পর্যন্ত কিয়ামত হবে না, যতদিন না লোকেরা মসজিদ নিয়ে গর্ব ও অহঙ্কার করবে।’

(ইবনে মাজাহ-৭৩৯, নাসায়ি-৬৮৯, আবু দাউদ-৪৪৯, দারিমি-১৪০৮, মিশকাত-৭১৯, বুলুগুল মারাম-২৬৩, মুসনাদে আহমাদ-১১৯৭১, ১২০৬৪, ১২১২৮, ১২৯৯১, ১৩৬০৬)

ইমাম বুখারি রহ. তার সহিহ বুখারির কিতাবুস সালাত অধ্যায়ে মসজিদ নির্মাণ-সংক্রান্ত হাদিসের আলোচনা করার আগে আনাস বিন মালেক রা: থেকে বর্ণনা করে বলেন, ‘লোকেরা মসজিদ নিয়ে গর্ব করবে; কিন্তু ইবাদতের মাধ্যমে তা আবাদ করবে না।’ (বুখারি, অধ্যায় : কিতাবুস সালাত (৮/৬২)

সুতরাং মসজিদকে বাহ্যিকভাবে প্রাসাদের মতো সাজিয়ে যদি আমরা আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল থাকি, তবে তা কিয়ামতের অশুভ লক্ষণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

২. অতিরিক্ত আলোকসজ্জা ও অপচয় : মসজিদের প্রয়োজনে যতটুকু আলো দরকার তার বাইরে স্রেফ প্রদর্শনীর জন্য মরিচ বাতি বা ঝাড়বাতি ব্যবহার করা ‘ইসরাফ’ বা অপচয়ের শামিল। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন- ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই’। (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-২৭)

ফাতাওয়ায়ে আলমগীরিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, মসজিদের একান্ত প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত জাঁকজমক বা আলোকসজ্জা করার পেছনে অর্থ ব্যয় করা জায়েজ নয়। (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরি, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৪৬১)

৩. ইবাদতে বিঘœ ও মাকরুহ আমল : মসজিদের ভেতরে বা বাইরে এমন কোনো কারুকার্য বা আলোকসজ্জা করা ফকিহদের মতে ‘মাকরুহ’ বা অপছন্দনীয়, যা মুসল্লিদের মনোযোগ বিচ্যুত করে। (ফাতাওয়ায়ে শামি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৬৫৬)

হজরত উমার রা: যখন মসজিদে নববীর পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারের কাজ শুরু করেন, তখন তিনি স্থপতি বা নির্মাণকারীকে মসজিদকে জাঁকজমক করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন মসজিদ যেন হয় সাদামাটা এবং ইবাদতের উপযোগী, লোকদেখানো কোনো প্রাসাদ নয়। তিনি বলেন, ‘(এমনভাবে মসজিদ নির্মাণ করো) যাতে মানুষের জন্য বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার ব্যবস্থা হয়; কিন্তু সাবধান! লাল বা হলুদ রঙে রঞ্জিত বা সুসজ্জিত করো না, যা মানুষকে ফিতনায় ফেলবে।’ (ফাতহুল বারি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৩৯)

৪. আমাদের করণীয় ও পূর্বসূরিদের সতর্কতা : হজরত আলী রা: থেকে বর্ণিত- ‘অদূর ভবিষ্যতে মানবজীবনে এমন একটি সময় আসবে, যখন ইসলামের নাম আর কুরআনের শব্দ-বাক্য ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। তারা তাদের মসজিদগুলোকে প্রাসাদ বানাবে বটে; কিন্তু সেগুলা আল্লাহর স্মরণ থেকে শূন্য থাকবে...।’ (তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড- ১২, পৃষ্ঠা-২৮০)

হজরত ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আমি মসজিদসমূহকে জাঁকজমকপূর্ণ বা সুউচ্চ করার জন্য আদিষ্ট হইনি।’ (আবু দাউদ-৪৪৮, ইবনে মাজাহ-৭৪০, ইবনে হিব্বান-১৬১০, মিশকাত-৭১৮, ফাতহুল বারি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৩৯)

এরপর ইবনে আব্বাস রা: স্বীয় অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, ‘তোমরা অবশ্যই মসজিদগুলোকে সুসজ্জিত করবে, যেমন ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা (তাদের উপাসনালয়কে) সুসজ্জিত করেছিল।’ (আবু দাউদ-৪৪৮, ইবনে মাজাহ-৭৪০, মিশকাত-৭১৮, সহিহ বুখারি, অধ্যায় : কিতাবুস সালাত, পরিচ্ছেদ : মসজিদ নির্মাণ-সংক্রান্ত, ফাতহুল বারি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৩৯)

উপসংহার : আসুন, আমরা বাহ্যিক চাকচিক্য ও প্রদর্শনী পরিহার করে মসজিদের আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য অর্থাৎ- নামাজ, তিলাওয়াত ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর ঘর আবাদ করার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : কলামিস্ট