জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে না এপ্রিলে
স্বাভাবিক সরবরাহের আশ্বাস সরকারের
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
এপ্রিল মাসজুড়ে দেশে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ নির্দেশিকা (সংশোধিত) অনুযায়ী ভোক্তা পর্যায়ে বর্তমানে যে দাম কার্যকর রয়েছে, সেটিই বহাল থাকবে। নতুন এই সিদ্ধান্ত আজ ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে বলে বলে মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বর্তমানে ডিজেল প্রতি লিটার ১০০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এপ্রিল মাসেও এসব দামে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। এর আগে সকালে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন মূল্য ঘোষণা হতে পারে বলে আলোচনা থাকলেও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকার শেষ পর্যন্ত দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মুনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘সরকার বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি সক্ষমতা এবং মজুদ পরিস্থিতি বিবেচনায় ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যমান মূল্য বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশে মোট এক লাখ ৯২ হাজার ৯১৯ টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে, যা দিয়ে ১৫ থেকে ১৬ দিনের জাতীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। মজুদের মধ্যে রয়েছে ডিজেল এক লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ টন, অকটেন ৭ হাজার ৯৪০ টন, পেট্রোল ১১ হাজার ৪৩১ টন এবং জেট ফুয়েল ৪৪ হাজার ৬০৯ টন। সরকারি হিসাবে, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল, যা মূলত কৃষি, সেচ ও গণপরিবহনে ব্যবহৃত হয়। এ কারণে ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। যুগ্মসচিব আরো জানান, এপ্রিল মাসে আরো প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন ডিজেল দেশে পৌঁছবে, ফলে জ্বালানি সঙ্কটের কোনো আশঙ্কা নেই। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রয়েছে। কৃষি ও পরিবহন খাতের চাহিদা পূরণে আমরা বিশেষ নজর রাখছি।’
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা থাকা সত্ত্বেও দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য চাপ মোকাবেলায় সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, অফিস সময় কমানো এবং অনলাইন ক্লাস চালুর মতো জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপও বিবেচনায় রয়েছে।
এ দিকে, জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ও পাচার রোধে সরকার পরিচালিত বিশেষ অভিযানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ৩০ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে পরিচালিত অভিযানে মোট ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজেল ৬৭ হাজার ৪০০ লিটার, অকটেন ৬৪৪ লিটার এবং পেট্রোল ১৩ হাজার ৮৫৬ লিটার। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এক দিনেই সারা দেশে ৩৯১টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে ১৯১টি মামলা দায়ের, ৯ লাখ ৩ হাজার ৫৭০ টাকা অর্থদণ্ড এবং তিনজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। সাতক্ষীরায় এক ব্যক্তিকে দুই বছর, চাঁদপুরে আরেকজনকে এক বছর এবং অন্য এক স্থানে এক মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। চলমান অভিযানের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রণালয় জানায়, এখন পর্যন্ত সারা দেশে তিন হাজার ৫৫৯টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে এক হাজার ২৪৪টি মামলা, ৮৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা জরিমানা এবং ১৯ জনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া মোট দুই লাখ ৯৬ হাজার ৩০৫ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজেল দুই লাখ ৭৩ হাজার ৬৫ লিটার, অকটেন ২৮ হাজার ৯৩৮ লিটার এবং পেট্রোল ৬০ হাজার ২ লিটার। সরকারের মতে, এই পরিসংখ্যান অবৈধ জ্বালানি মজুদের ব্যাপকতা এবং তা রোধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে।
জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও নজরদারি বাড়াতে নতুন উদ্যোগ হিসেবে সারা দেশের ফিলিং স্টেশনভিত্তিক ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানায়, ঢাকা বিভাগে ১৩ জেলায় ৪৭৯ জন এবং মহানগর এলাকায় ১১৬ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে চট্টগ্রাম বিভাগে ১১ জেলায় ৩৩০ জন এবং মহানগরে ৬২ জন কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। এ ছাড়া রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগেও একই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের আশা, এসব কর্মকর্তার নিবিড় তদারকির ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরো বাড়বে। সংবাদ সম্মেলনে হজ মৌসুমকে সামনে রেখে জেট ফুয়েলের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়। বিমান চলাচল নির্বিঘœ রাখতে এ খাতে আলাদা নজরদারি থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সামগ্রিকভাবে সরকার বলছে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশের জ্বালানি খাত এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মূল্য অপরিবর্তিত রাখা, পর্যাপ্ত মজুদ, নতুন আমদানি এবং অবৈধ মজুদবিরোধী অভিযান- সব মিলিয়ে এপ্রিল মাসে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলেই সরকারের প্রত্যাশা।