বি শ্ব কু ষ্ঠ নি র্মূ ল দি ব স

কুষ্ঠ পাপের ফসল নয়

অনেকের এখনো ধারণা আছে কুষ্ঠ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। এটি ভালো হয় না। এটি পুরোপুরি মিথ্যা। কুষ্ঠ রোগের এখন আধুনিক চিকিৎসা আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিকিৎসা নির্ধারণ করে দিয়েছে

Printed Edition

নিরাময় ডেস্ক

কয়েক বছর আগে নীলফামারীতে বেসরকারিভাবে পরিচালিত একটি কুষ্ঠ চিকিৎসা কেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এর আগে কখনো কুষ্ঠ রোগী দেখিনি। হাত-পায়ে অপারেশন করা অনেককে দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম। বেশ কয়েকজনের সাথে আলাপ হয়। বেশির ভাগই বিষণœ ছিল। মেয়েরা ছিল বেশি অসহায়। এক নারীর মুখ এখনো মনে পড়ে। বগুড়ার সে মেয়েটিকে কুষ্ঠ ধরা পড়ার সাথে সাথে স্বামী তাকে খারাপ মেয়ে মনে করে তাড়িয়ে দেয়। দু’বছরের মেয়েটাকে ফেলে বাবার বাড়িতে আসতে বাধ্য হয়। এলাকার লোকজনও তাকে একঘরে করে রাখে। বিনা চিকিৎসায় অনেকটা সময় কেটে যায় তার। এর মধ্যে পায়ে ক্ষত দেখা দেয়। পরে প্রতিবেশী একজনের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি হয় সে। তার বোবা কান্নায় আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় দীর্ঘদিন। তার বারবার আকুতি ছিল আমি খারাপ মেয়ে নই। আমার মেয়ের মুখ একবার দেখার সুযোগ চাই। এ নিরীহ মেয়েটির মতো এখনো সমাজে কুষ্ঠ রোগীরা নিগৃহীত হয়। এখনো মনে করা হয় কুষ্ঠ পাপের ফসল। এটা পুরোপুরি মিথ্যা। কুষ্ঠ পাপের ফসল নয়। এটা ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ। যক্ষ্মা যেমন পাপের ফসল নয়, ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ।

কুষ্ঠ কিন্তু বহু পুরোনো রোগ। এটি প্রায় ৪ হাজার বছর ধরে মানুষকে আক্রান্ত করে আসছে। তবে দিন দিন আক্রান্তের হার কমে আসছে। কুষ্ঠ রোগের কার্যকরি ওষুধ আবিষ্কারের পর থেকে কমছে আক্রান্তের হার। ১৯৯৫ সালে ২০-৩০ লাখ ব্যক্তির কুষ্ঠে আক্রান্ত হয়ে অঙ্গহানির ঘটনা ঘটে। কিন্তু সময়ের সাথে এ অবস্থার উন্নতি ঘটে। ২০১০ সালে সারা বিশ্বের প্রায় আড়াই লাখ কুষ্ঠ আক্রান্ত রোগীর পরিচয় মেলে। তাই বলে কুষ্ঠ কিন্তু এখনো বিশ্বব্যাপী নির্মূল হয়নি। এখনো প্রতি দুই মিনিটে একজন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়। কুষ্ঠ নিয়ে সচেতনতা ও বিশ্বকে কুষ্ঠ মুক্ত করার জন্য প্রতি বছর জানুয়ারির শেষ রোববার পালিত হয় বিশ্ব কুষ্ঠ নির্মূল দিবস। এ ধারাবাহিকতায় এ বছরের ২৬ জানুয়ারি পালিত হলো এ দিবসটি।

কুষ্ঠ মাইকো ব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়ে থাকে। এ ব্যাকটেরিয়া দীর্ঘদিন শরীরে রোগ প্রকাশ না করে থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তা ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হতে পারে। তবে শিশুদেরও কুষ্ঠ হতে পারে। বর্তমানে কোনো কোনো দেশে কুষ্ঠ আক্রান্তের ৪৫ ভাগ শিশু।

কুষ্ঠ কিভাবে ছড়ায় তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এটি রেসপিরেটরি ড্রপলেট বা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। তবে যৌন মিলনের মাধ্যমে এটি ছড়ায় না বলেই অভিমত বিশেষজ্ঞদের। কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তি ২ সপ্তাহ ওষুধ সেবন করলে রোগ ছড়ায় না বলে জানা গেছে বিভিন্ন গবেষণায়।

কুষ্ঠ রোগের লক্ষণ হলো শরীরে সাদা চাকতির মতো দাগ। এ দাগ একটি বা একাধিক হতে পারে। ২-৫টি দাগ থাকলে তাকে পাউসিবেসিলারি আর পাঁচটির বেশি দাগ থাকলে তাকে মাল্টিবেসিলারি কুষ্ঠ বলা হয়। এ দাগগুলো অনুভুতিহীন হয়ে থাকে। কুষ্ঠ রোগে ¯œায়ু আক্রান্ত হয়ে শক্ত বা মোটা হয়। এতে করে ওই ¯œায়ু শরীরের যে অংশে অনুভূতি সরবরাহ করে তা অনুভূতিহীন হয়ে যায়। সাধারণত মুখ, হাত ও পায়ের ¯œায়ু বেশি আক্রান্ত হয়। ফলে হাত-পায়ে সহজেই ক্ষত সৃষ্টি হয়। অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া সহজেই আক্রান্ত করতে পারে। চিকিৎসা না করালে ক্ষত মারাত্মক আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে অপারেশনের মাধ্যমে কেটে ফেলে দেয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে। আক্রান্ত ত্বক বিশেষ প্রক্রিয়া করে পরীক্ষা করলে অনেক সময় অনুজীব ব্যাকটেরিয়া দেখা যায়।

অনেকের এখনো ধারণা আছে কুষ্ঠ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই। এটি ভালো হয় না। এটি পুরোপুরি মিথ্যা। কুষ্ঠ রোগের এখন আধুনিক চিকিৎসা আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিকিৎসা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তবে ওষুধ নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদে সেবন করতে হয়। কুষ্ঠ রোগের ওষুধ নিয়মিত সেবন না করলে তা প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। যেহেতু কুষ্ঠ রোগের বিকল্প চিকিৎসা নেই তাই এমনটি হলে কিন্তু ফলাফল ভয়াবহ হতে পারে। তাই কুষ্ঠ রোগীদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ সেবন করতে হবে।