মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় অস্থির পুঁজিবাজার
ডিএসইএক্স কমল ১৩৮ পয়েন্ট
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলার জেরে আবারো অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের পুঁজিবাজার। শনিবার ভোরে শুরু হওয়া এ হামলা সারা দিনব্যাপী চলায় তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। একইভাবে এর প্রভাব পড়ে দেশের শেয়ারবাজারেও। লেনদেনের পুরো সময়জুড়ে দেশের দুই পুঁজিবাজারই ছিল তীব্র বিক্রয়চাপে অস্থির।
ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে দেখা যায় শেয়ার বিক্রির হিড়িক। লেনদেনের শুরুর দিকে কে কার আগে বিক্রি করবেন- এমন প্রতিযোগিতাই যেন চলছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এর আগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল।
লেনদেন শুরুর প্রথম মিনিটেই দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক হারায় ২২৩ পয়েন্ট। আগের দিনের পাঁচ হাজার ৬০০ দশমিক ২৬ পয়েন্ট থেকে শুরু করে সকাল ১০টা ১ মিনিটে সূচক নেমে আসে পাঁচ হাজার ৩৭৬ দশমিক ৭৭ পয়েন্টে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সূচক ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। সকাল ১০টা ২০ মিনিটে তা উঠে যায় পাঁচ হাজার ৪৯২ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে হারানো সূচকের একটি অংশ পুনরুদ্ধার হয়।
কিন্তু এরপর আবারো তৈরি হয় নতুন বিক্রয়চাপ। বেলা পৌনে ১১টায় সূচক নেমে আসে পাঁচ হাজার ৪৪২ পয়েন্টে। সেখান থেকে আবারো ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফিরে বাজার। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সূচক দিনের সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৪৯২ পয়েন্টে পৌঁছে। দিনের বাকি সময় বাজার কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও লেনদেনের শেষদিকে সৃষ্ট বিক্রয়চাপের কারণে পুনরুদ্ধার করা সূচকের একটি অংশ আবার হারায় ডিএসই।
দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৩৮ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় পাঁচ হাজার ৪৬১ দশমিক ৭০ পয়েন্টে। দিনের শুরুতে সূচক ছিল পাঁচ হাজার ৬০০ দশমিক ২৬ পয়েন্টে। একই সময়ে ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচক কমে যথাক্রমে ৫২ দশমিক ০৮ ও ২৬ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) দেখা যায় একই চিত্র। বাজারটির প্রধান সূচক সিএএসপিআই কমে ২৫১ দশমিক ৮৫ পয়েন্ট। সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচক যথাক্রমে ৩১৪ দশমিক ৩৭ ও ১৭১ দশমিক ১৮ পয়েন্ট হ্রাস পায়।
রোববার ছিল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস। সাধারণত সকাল ১০টায় লেনদেন শুরু হলেও বিনিয়োগকারীরা ধীরে সুস্থে ট্রেডিং ফ্লোরে আসেন। তবে গতকাল ছিল ব্যতিক্রম। সকাল হওয়ার আগেই ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলো বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে যায়। এরপরই শুরু হয় বিক্রয় আদেশ দেয়ার প্রতিযোগিতা। শুরুতেই বড় ধরনের বিক্রয়চাপে পড়ে বাজার। যেখানে ক্রেতা পাওয়া গেছে, সেখানেই শেয়ার বিক্রির আদেশ দিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। সম্প্রতি যেসব খাতে তুলনামূলক বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল, সেসব খাতেই বিক্রয়চাপ ছিল বেশি।
বরাবরের মতো গতকালও সূচকের অবনতিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল ব্যাংকিং খাতের। তবে এ খাতের আচরণ ছিল কিছুটা মিশ্র। কয়েকটি ব্যাংকিং কোম্পানি মূল্যবৃদ্ধির তালিকায়ও জায়গা করে নেয়। বিক্রেতার অভাবে একটি কোম্পানির শেয়ার দিনের সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানি শাইনপুকুর সিরামিকসও বেশ কিছু সময় বিক্রেতা সঙ্কটে ছিল এবং দিনভর সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হয়।
দুই পুঁজিবাজারেই অধিকাংশ খাত দরপতনের শিকার হয়েছে। কোনো কোনো খাতে তালিকাভুক্ত শতভাগ কোম্পানির শেয়ারদর হারিয়েছে। তবে ব্যতিক্রম ছিল ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত। এ খাতের কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার দিনের সর্বোচ্চ দরে লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ছিল প্রাইম ফিন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, পিপলস লিজিং ও বিআইএফসি।
ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৯টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩০টির দর বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে ৩৫৩টির। অপরিবর্তিত ছিল ছয়টির দর। অন্যদিকে সিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৮৪টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৩টির দাম বেড়েছে, ১৩৪টির কমেছে এবং ১৭টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, পুঁজিবাজার অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের এ ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। তবে বিনিয়োগকারীদের উচিত আতঙ্কিত না হয়ে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেয়া। কারণ বৈশ্বিক সঙ্কটে বিশ্বের প্রায় সব পুঁজিবাজারই কমবেশি প্রভাবিত হয়, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেগুলো আবার ঘুরে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, আমাদের পুঁজিবাজার বড় পতনের মুখে পড়লে স্বাভাবিক হতে সময় নেয়। অনেক সময় বিনিয়োগকারীরা তাৎক্ষণিক আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্তে নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই শেয়ার বিক্রি করেন। অথচ পরিস্থিতি একদিন পরই বদলে যেতে পারে- এ বিষয়টি অনেকে বিবেচনায় নেন না। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরও বাজার দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণের শিকার হয়েছিল। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য ও পরিপক্ব সিদ্ধান্তই বাজার পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারে। সঠিক কৌশল ও আত্মবিশ্বাস থাকলে বাজার আবারো ঘুরে দাঁড়াবে।
এ দিকে টানা চতুর্থ দিনের মতো গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ব্যাংকিং খাতের সিটি ব্যাংক। কোম্পানিটির এক কোটি ২৪ লাখ ৪১ হাজার শেয়ার ৩৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকায় হাতবদল হয়েছে। ২৭ কোটি ৩০ লাখ টাকার লেনদেনে ৫০ লাখ ৫২ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ।
ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির তালিকায় আরো ছিল, ওরিয়ন ইনফিউশন, রবি আজিয়াটা, ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও ঢাকা ব্যাংক।