গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত
  • ত্রাণকর্মীদের ওপর পরিকল্পিত হামলা, তদন্তে ভয়াবহ তথ্য
  • ২০২৫ সালে সাংবাদিক হত্যায় রেকর্ড, দায়ী ইসরাইল

ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী শিগগিরই কাজ শুরু করতে পারে বলে জানিয়েছেন বোর্ড অব পিসের গাজা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই মøাদেনভ। তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যেই বাহিনীটির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। খবর তাস নিউজের। এই বাহিনীতে আলবেনিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান, মরক্কো ও কসোভো সেনা পাঠানোর কথা রয়েছে। মিসর ও জর্দান ফিলিস্তিনি পুলিশদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নেবে বলে জানা গেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ২০ হাজার সেনা ও ১২ হাজার পুলিশ গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ কার্যকর হয়। পরবর্তী ধাপে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ গাজার প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত

এ দিকে চলমান যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে গাজায় নতুন করে ইসরাইলি হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। বুধবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের আল-মাওয়াসি এলাকায় ড্রোন হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। আহতদের নাসের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় দেয়া একটি বিদ্যালয়ের কাছেও গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে। মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলার ঘটনাও ঘটেছে, যদিও সব ক্ষেত্রে হতাহতের তথ্য মেলেনি। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় ভয়াবহ মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, শত শত বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এ দিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় তিন ফিলিস্তিনি নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। আগের হামলায় নিহত আরো ছয়জনের লাশ ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে; তবে উদ্ধারকাজে যন্ত্রপাতির ঘাটতির কথা জানানো হয়েছে। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের মাওয়াসি এলাকার বির ১৯ অঞ্চলে ড্রোন হামলায় এক ফিলিস্তিনি নিহত ও কয়েকজন আহত হন। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রসংলগ্ন স্কুলের কাছে গুলিবর্ষণে একজন আহত হন। গাজা সিটি ও বুরেইজ শিবির এলাকায়ও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।

গাজায় ত্রাণকর্মীদের ওপর পরিকল্পিত হামলা, তদন্তে ভয়াবহ তথ্য

গাজার রাফাহর তাল আস-সুলতান এলাকায় ত্রাণকর্মীদের বহরের ওপর ইসরাইলি সেনাদের হামলা ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও নির্মম- এমন তথ্য উঠে এসেছে এক যৌথ আন্তর্জাতিক তদন্তে। ফরেনসিক আর্কিটেকচার ও ইয়ারশট নামের দু’টি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের মার্চে ত্রাণবাহী গাড়িতে ৯ শতাধিক গুলি চালানো হয়। খবর আলজাজিরার।

এই হামলায় ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট, সিভিল ডিফেন্স ও জাতিসঙ্ঘের এক কর্মীসহ মোট ১৫ জন ত্রাণকর্মী নিহত হন। তদন্তে দেখা গেছে, কোনো পাল্টা গুলিবর্ষণ হয়নি এবং আহতদের কাছ থেকে অতি নিকটবর্তী দূরত্বে গুলি চালানো হয়েছে, যা কার্যত মৃত্যুদণ্ডের শামিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার পর বুলডোজার দিয়ে গাড়ি ও লাশ বালির নিচে চাপা দেয়া হয়, যাতে প্রমাণ নষ্ট হয়। একজন জীবিত ত্রাণকর্মীকে আটক করে নির্যাতনের অভিযোগও উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি যুদ্ধাপরাধের স্পষ্ট উদাহরণ। তবে আন্তর্জাতিক ক্ষোভ সত্ত্বেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর কোনো বিচারিক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

গাজা যুদ্ধের পর ইসরাইলে জাতীয় উচ্ছেদ পরিকল্পনার ঘাটতি : রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষক

গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হলেও ইসরাইল সরকারের কাছে কোনো জাতীয় পর্যায়ের উচ্ছেদ পরিকল্পনা ছিল না- এমন তথ্য উঠে এসেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষক নেতানিয়াহু ইংলম্যানের প্রতিবেদনে। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে জনগণকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির ভয়াবহ ঘাটতি ছিল। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে দুই লাখের বেশি মানুষকে তাৎক্ষণিক ও অস্থায়ী ব্যবস্থায় সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় সরকার ও সেনাবাহিনী। এতে স্থানীয় প্রশাসন চরম চাপের মুখে পড়ে। ইংলম্যান জানান, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে উচ্ছেদ পরিকল্পনার দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘ দিনের বিরোধ রাজনৈতিক পর্যায়ে নিষ্পত্তি হয়নি, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি জানানো সত্ত্বেও। বর্তমানে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ইংলম্যান হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার ও সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।

২০২৫ সালে সাংবাদিক হত্যায় রেকর্ড, দায়ী ইসরাইল

বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালে ১২৯ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে সাংবাদিকদের সুরক্ষা কমিটি। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এর দুই-তৃতীয়াংশ হত্যাকাণ্ডে ইসরাইল দায়ী। টিআরটি ওয়ার্ল্ড। নিহত সাংবাদিকদের অধিকাংশই গাজায় কর্মরত ফিলিস্তিনি ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকায় সাংবাদিকরা ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। সিপিজে সতর্ক করে বলেছে, সাংবাদিক হত্যা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জনগণের তথ্য জানার অধিকারকেও ধ্বংস করে।

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইসরাইলি অভিযান, বসতি স্থাপনকারীদের হামলা

অধিকৃত পশ্চিমতীরের রামাল্লাহর উত্তর-পূর্বে সিনজিল শহরে ইসরাইলি সেনারা ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফার বরাতে আলজাজিরা জানায়, সেনারা বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে বাসিন্দাদের মারধর করে, দরজা ভেঙে ফেলে এবং ঘরবাড়ির আসবাব নষ্ট করে। এ ছাড়াও পশ্চিমতীরে নাবলুসের পূর্বে বালাতা শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলি বাহিনী অভিযান চালিয়ে অন্তত এক ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়। অভিযানে ড্রোন, গুলিবর্ষণ ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই দিনে বিভিন্ন এলাকায় আরো ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ দিকে জেনিনের দক্ষিণে আনজা গ্রামের প্রবেশমুখে বুলডোজার ব্যবহার করে ভবন ও দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনিদের বসতভিটা ও জীবিকা ধ্বংস করা হচ্ছে।

হেবরনের পূর্বে মাসাফের বানি নাঈম এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের নিরাপত্তায় ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা এক ফিলিস্তিনি বন্দীর বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় একটি ভেড়া হত্যা করা হয়, ৩০টি ভেড়া লুট করা হয় এবং একটি গাড়ির চাকা কেটে দেয়া হয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব হামলা ও উচ্ছেদ কার্যক্রম ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি থেকে উৎখাতের ধারাবাহিক কৌশলের অংশ। পশ্চিমতীরে সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলছে। পশ্চিমতীরের দক্ষিণাঞ্চলের মাসাফের ইয়াত্তার খিরবেত আল-মারকাজ এলাকায় এক ইসরাইলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ফিলিস্তিনি এক নারীর ওপর হামলা চালিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত মঙ্গলবার ওই ব্যক্তি গ্রামে ঢুকে ঘরবাড়ি ও গবাদিপশুর খোঁয়াড়ে তল্লাশি চালানোর পর নারীটিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারী গ্রামটির ভেতরে অবস্থান করছে এবং নারীটির ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। আহত নারীর শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। বাসিন্দারা জানান, এই ঘটনায় বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মাসাফের ইয়াত্তা এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরেই অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ঘরে অনুপ্রবেশ ও ফিলিস্তিনি জমিতে পশু চরানোর ঘটনা ঘটছে।

গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমতীরে সহিংসতা বেড়েছে। ফিলিস্তিনি হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার আহত হয়েছেন।

নতুন আইন ঘিরে পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনি জমি দখল ত্বরান্বিত

দখলকৃত পশ্চিমতীরে নতুন ভূমি নিবন্ধন আইন কার্যকরের মাধ্যমে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল আরো দ্রুত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হেবরনের আহমাদ সালহাবের তিনতলা বাড়ি ভেঙে দেয়ার ঘটনা এই নীতির প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। খবর টিআরটি ওয়ার্ল্ড। নতুন আইনে ‘নথিহীন’ জমিকে রাষ্ট্রীয় ভূমি হিসেবে ঘোষণা করে বসতি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ১৯০৭ সালের হেগ বিধিমালার লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিনিদের কৃষি, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহে ভারতের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

গাজায় চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইসরাইলের কাছে ভারত থেকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহের অভিযোগ সামনে এসেছে। আলজাজিরার দেখা নথি অনুযায়ী, ভারত থেকে একটি জাহাজে বিপুল পরিমাণ রকেট ইঞ্জিন, বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ ইসরাইলের বন্দরের দিকে পাঠানো হয়। স্পেনের উপকূলে ওই জাহাজ ভিড়তে না পারলেও পরে অন্য ইউরোপীয় বন্দরের দিকে যাত্রা করে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্য এ ধরনের অস্ত্র পরিবহনকে গণহত্যার তদন্তাধীন রাষ্ট্রে সহায়তা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত প্রকাশ্যে শান্তি ও সংলাপের পক্ষে কথা বললেও নীরবে সামরিক সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। স্টকহোমভিত্তিক গবেষণা সংস্থা জানায়, ভারতীয় কোম্পানিগুলো ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সরবরাহ করে থাকে। ভারতের সরকার এ বিষয়ে প্রকাশ্যে স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি। তবে এই অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ দেশটির ঐতিহ্যগত ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।