পাটগ্রাম সীমান্তে হাতবোমা বিস্ফোরণ
পুশইনে ব্যর্থ হয়ে ১২ জনকে ফিরিয়ে নিলো বিএসএফ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
অব্যাহত তৎপরতার অংশ হিসেবে গত ২৪ ঘণ্টায় তিনটি সীমান্ত এলাকা দিয়ে জোরপূর্বক পুশইনের (বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ) চেষ্টা চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় গ্রামবাসীদের তীব্র প্রতিরোধে ভারতীয় বাহিনীর এই অনৈতিক চেষ্টাগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। পুশইনের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় এক সীমান্তে বিএসএফ হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, অন্য সীমান্তে শূন্যরেখার ডোবায় বৃদ্ধকে আটকে রেখে উত্তেজনা বাড়িয়েছে এবং কুষ্টিয়া সীমান্তে টানা চার দিন খোলা আকাশের নিচে আটকে রাখার পর ১২ জনকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। সীমান্তজুড়ে বিএসএফের এমন উসকানিমূলক আচরণে বর্ডারজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ও স্থানীয়দের মাঝে গভীর আতঙ্ক বিরাজ করছে।
লালমনিরহাট
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্ত দিয়ে গত রোববার রাতে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিজিবির ৬১ ব্যাটালিয়নের (তিস্তা-২) সহকারী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক গতকাল সোমবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে পাটগ্রাম উপজেলার কালীরহাট সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ায় থাকা বিএসএফের সার্চলাইট হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ভারতের দিক থেকে তিনজন ব্যক্তিকে কাঁটাতারের গেট দিয়ে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করে বিএসএফ সদস্যরা। খবর পেয়ে দ্রুত বিজিবি সদস্যরা সীমান্তে সতর্ক অবস্থান নেন এবং স্থানীয় গ্রামবাসীরাও লাঠিসোটা নিয়ে সীমান্তে জড়ো হন।
সতর্ক অবস্থান ও সর্বসাধারণের প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা ব্যর্থ হয়। অনুপ্রবেশে ব্যর্থ হয়ে ক্ষুব্ধ বিএসএফ সদস্যরা সীমান্ত এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করতে দু’টি হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। পরে পুশইনের জন্য আনা ব্যক্তিদের আবার ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য হয় তারা। ৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ ফজলে মুনীম জানান, বিজিবির কঠোর ও সতর্ক অবস্থানের কারণেই এই পুশইন প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
জয়পুরহাট
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার হাটখোলা সীমান্তে ৭০ থেকে ৭৫ বছর বয়সী এক ভারতীয় বৃদ্ধকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। রোববার হাটখোলা সীমান্তের ২৭৯ নম্বর প্রধান পিলারের ২৭ নম্বর সাব-পিলার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সকালে সীমান্তে মাঠে কর্মরত কৃষকদের কাছে এসে ওই বৃদ্ধ খাবার ও পানি চান এবং নিজেকে ভারতের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি জানান, ভোরের দিকে বিএসএফ তাকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। কৃষকেরা বিষয়টি দ্রুত হাটখোলা বিজিবি ক্যাম্পে জানালে বিজিবি সদস্যরা এসে তাৎক্ষণিকভাবে বৃদ্ধকে ভারতের ভূখণ্ডে পাঠিয়ে দেন এবং বাংলাদেশ সীমান্তে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেন।
তবে ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত না নিয়ে বিএসএফ সদস্যরা ওই বৃদ্ধকে ভারত সীমান্তের শূন্যরেখার একটি ডোবার মধ্যে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখে। রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত বৃদ্ধকে শূন্যরেখায় বসিয়ে রাখায় ও বিএসএফের অনড় অবস্থানের কারণে সীমান্ত এলাকায় চরম উত্তেজনা ও কৃষকদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দেয়। জয়পুরহাট ২০ বিজিবির অধিনায়ক লতিফুর বারী বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকতে দেয়া হবে না। বিজিবি সদস্যরা সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
কুষ্টিয়া
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে টানা ৮০ ঘণ্টা ধরে পুশইনের শিকার হয়ে সীমান্তের শূন্যরেখার ভারতীয় অংশের একটি পাটখেতে আটকে থাকা চারটি শিশু ও চারজন নারীসহ মোট ১২ জন নাগরিককে অবশেষে নিজেদের হেফাজতে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ।
দৌলতপুর সংবাদদাতা জানিয়েছেন, গত শুক্রবার ভোরে বিএসএফের প্রাগপুর সীমান্ত দিয়ে এই ১২ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত প্রতিরোধে তারা সীমান্তের শূন্যরেখার ভারতীয় অংশের পাটখেতে আটকা পড়ে। খোলা আকাশের নিচে টানা চার দিন খাবার, পানি ও আশ্রয়ের তীব্র সঙ্কটে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে আটকে থাকায় শিশু ও নারীদের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে এবং সীমান্তে এক ভয়াবহ মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও বিজিবি সীমান্তে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে অনড় অবস্থান বজায় রাখে এবং স্থানীয় বাসিন্দারাও সীমান্তে কড়া নজরদারি চালায়। অবশেষে গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে একটি জরুরি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেলা ১১টার দিকে বিএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে ওই ১২ জনকে নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নেয়। ৮০ ঘণ্টার পর এই অচলাবস্থার অবসান ঘটায় সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। বিজিবি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া বাংলাদেশের সীমানায় কাউকে কোনোভাবেই প্রবেশ করতে দেয়া হবে না।