সংশোধন শেষে ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়াল পুঁজিবাজার

সূচকের উত্থানে প্রধান ভূমিকা ব্যাংকিং খাতের

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজার। গত সপ্তাহের প্রথম দিকে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটার পর গত তিন দিন বাজারগুলো স্বাভাবিক সংশোধনের মধ্য দিয়ে পার করে। সংশোধন শেষ করে গতকাল আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাজারগুলো। এ সময় উভয় পুঁজিবাজারে সূচকের যেমন বড় ধরনের উন্নতি ঘটে তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে লেনদেনও। লেনদেনের শুরু থেকে বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়াই সাবলীলভাবেই গতকাল লেনদেন শেষ করে দুই পুঁজিবাজার। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটাই পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক আচরণ। কারণ যেকোনো বাজারে মূল্যবৃদ্ধি যেমন ঘটবে তেমনি তা টেকসই হতে সংশোধন ঘটতে হবে। সংশোধন শেষ করে নতুন করে গতি ফিরে পায় বাজার।

গতকাল লেনদেনের শুরু থেকেই ঊর্ধ্বমুখী ছিল দুই পুঁজিবাজার সূচক। প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে কোনো ধরনের বিক্রয়চাপ তৈরি না হওয়ায় একটি ভালো বাজারের প্রত্যাশা তৈরি হয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। ফলে তারা বাজারে সক্রিয় হতে শুরু করেন। এতে বিক্রয়চাপ তৈরির প্রবণতা হ্রাস পায়। দিনের বাকি সময় অনেকটা সাবলীলভাবেই এগিয়ে যায় বাজার সূচক। এ সময় লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানি ও ফান্ডগুলো একে একে গত কয়েক দিন ধরে হারিয়ে বসা দর ফিরে পেতে থাকে যা সূচককে এগিয়ে নিতে থাকে। একই সাথে বৃদ্ধি পায় অংশগ্রহণও। প্রথম দু’ঘণ্টায়ই ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেন ৩০০ কোটির ঘর অতিক্রম করে। এভাবে দিনশেষে দুই পুঁজিবাজার সূচক একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছে যায় যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৫৯ দশমিক ৮১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। পাঁচ হাজার ৮০ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ১৪০ দশমিক ৩৮ পয়েন্টে। সকালে লেনদেনের শুরুতেই ঊর্ধ্বমুখী আচরণ করতে দেখা যায় সূচকটিকে। বেলা দেড়টার আগেই সূচকটি পৌঁছে পাঁচ হাজার ১৫০ দশমিক ৭০ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৭০ পয়েন্ট। লেনদেনের এ পর্যায়ে মৃদু বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে সাময়িকভাবে নি¤œমুখী হয় সূচকটি। তবে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে দ্রুতই চাপ সামলে নেয় বাজারটি। দিনের বাকি সময় আর বড় কোনো বিক্রয়চাপ সৃষ্টি না হলে সূচকটি বড় ধরনের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর যথাক্রমে ২৬ দশমিক ৫৬ ও ১২ দশমিক ৪২ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১১৫ দশমিক ২২ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ১৪ হাজার ২৯১ দশমিক ৬০ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি মঙ্গলবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ১৪ হাজার ৪০৭ দশমিক ৫৬ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১১২ দশমিক ২৪ ও ৭৪ দশমিক ১৫ পয়েন্ট।

এ দিকে গতকাল পুঁজিবাজার বিশ্লেষণে দেখা যায় সূচকের বড় ধরনের উন্নতির পেছনে বড় ভূমিকাটি ছিল ব্যাংকিং খাতের। গত তিন দিন এ খাতে সংশোধন ঘটলেও গতকাল এ খাতে প্রায় ৮০ শতাংশ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। মূলধনসমৃদ্ধ এ খাতটিই গতকাল সূচককে এগিয়ে নেয়। এর পাশাপাশি অন্য খাতগুলোতেও কমবেশি মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। এতে ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় উঠে আসে ৬৮ শতাংশের বেশি কোম্পানি ও ফান্ড। তবে আগের দিনের মতো গতকালও বীমা খাতে সংশোধন ঘটতে দেখা যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, যেসব খাতে গত কয়েকদিন সংশোধন ঘটেছে সেগুলোতেই গতকাল মূল্যবৃদ্ধি ঘটে বেশি। ঢাকায় লেনদেন হওয়া ৩৯১টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৪৯টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ৮৩টি। ৫৯টি সিকিউরিটিজের দর ছিল অপরিবর্তিত। অপরদিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ১৭৮টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ১০৩টির মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, ৪৮টি দর হারায় এবং ২৭টির দর অপরিবর্তিত থাকে।

বিনিয়োগকারীরা গতকালের বাজার আচরণকে খুবই উপভোগ করেছেন। তারা নয়া দিগন্তকে জানান, দীর্ঘদিন পর তারা বাজারের স্বাভাবিক আচরণ দেখছেন। এর ফলে তারা লেনদেনে উৎসাহ যেমন পাচ্ছেন তেমনি সামনের দিনগুলোতে একটি ভালো বাজারের প্রত্যাশাও তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় বাজারের অন্য স্টেকহোল্ডাররা যদি সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করে তাহলে পুঁজিবাজার যৌক্তিক আচরণ ফিরে পাবে। এতে সবার পুঞ্জীভূত লোকসানও কমবেশি কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে। শুধু প্রয়োজন বাজার খেলোয়াড়দের ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধাণ থাকা, যাতে এ গ্রুপটি বাজারকে আবার নতুন করে অস্থিরতার দিকে নিয়ে যেতে না পারে।

গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে মোট ৬৯৩ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ২০১ কোটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৪৯২ কোটি টাকা। এটি ডিএসইর গত আড়াই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেন। এদিন চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের লেনদেন পৌঁছায় ১৩ কোটি টাকায়। আগের দিন কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে পুঁজিবাজারটি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে জায়গা করে নেয় ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশন। ২৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ছয় লাখ ৯৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকায় ১১ লাখ ১১ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই খাতের স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। লেনদেনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে- সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি, সিটি ব্যাংক, ফাইন ফুডস, এডিএন টেলিকম, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, সোনালি পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও রূপালি লাইফ ইন্স্যুরেন্স।

একই দিন ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল ইসলামী ব্যাংক। গতকাল কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল এডিএন টেলিকম। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, রূপালী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এম হোসাইন স্পিনিং, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, এপেক্স ট্যানারি ও ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স।