নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা মার্কিন ও আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে?

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে সঙ্ঘাতের সূচনা করেছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, কংগ্রেস কিংবা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের কোনো সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া এই যুদ্ধ শুরু করা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। তবে খামেনির মতো একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা এবং তাকে হত্যা করার বিষয়টি আইনি জটিলতাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।

সাধারণত যুদ্ধ চলাকালেও কোনো সার্বভৌম দেশের শীর্ষ নেতাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ও প্রকাশ্যে হত্যা করার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। এ ধরনের পদক্ষেপের আইনি বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবসময়ই প্রশ্ন থেকেছে। ইতিহাসের পাতায় এর কাছাকাছি একমাত্র নজির পাওয়া যায় ২০০৩ সালের মার্চে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে সাদ্দাম হোসেনকে বিমান হামলার মাধ্যমে হত্যা করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। যদিও সেই যুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাদ্দাম হোসেনকে লক্ষ্য করে চালানো সেই প্রাথমিক হামলাটি ব্যর্থ হয়েছিল।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, খামেনির ক্ষেত্রে এ ঘটনা আরো সংবেদনশীল। কারণ কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই একজন শীর্ষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা ‘টার্গেটেড কিলিং’ বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের আওতায় পড়ে, যা অনেক দেশই দণ্ডণীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। মার্কিন অভ্যন্তরীণ আইনেও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যা এখন নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। হোয়াইট হাউজকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আইনি ব্যাখ্যা দিতে বলা হলে তারা এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘প্রধান সেনাপতি হিসেবে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে অঞ্চলটিতে মার্কিন সেনা ও ঘাঁটি রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছেন।’ ইরানের কয়েক দশকের নানা ‘অপরাধের’ কথা বলা হলেও খামেনিকে হত্যার বিষয়টি সরাসরি ব্যাখ্যা করা হয়নি।

নিচে ইরানের বিরুদ্ধে এই দুই দেশের যুদ্ধ ও খামেনি হত্যার বিষয়গুলো ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো :

ইরানে কী ঘটেছে : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দুই দেশ যৌথভাবে ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আকস্মিক হামলা চালায়। এতে প্রায় চার দশক ধরে ইরানের শাসক থাকা কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। কর্মকর্তাদের ভাষ্যানুযায়ী, সিআইএ খামেনির গতিবিধি নজরদারি করে অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ইসরাইলকে দেয়। ইসরাইলই হামলা চালায়। সুযোগ কাজে লাগাতে পরিকল্পনাটি আগাম এগিয়ে আনা হয়েছিল বলে জানা যায়।

খামেনির অবস্থান কী ছিল : খামেনি ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তি। তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীর ইউনিফর্মধারী সদস্য ছিলেন না। তবে তিনি একই সাথে ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়কও ছিলেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট বেসামরিক হলেও সামরিক বাহিনীর প্রধান কমান্ডার। এই ‘দ্বৈত’ অবস্থান আইনি জটিলতা তৈরি করে। সাধারণভাবে যুদ্ধে একটি দেশের সামরিক কমান্ডাররা বৈধ লক্ষ্যবস্তু। আবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো সামরিক দায়িত্বহীন বেসামরিক কর্মকর্তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলে বৈধ লক্ষ্যবস্তু নন। কিন্তু একজন বেসামরিক নেতা, তিনি সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন- এ ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল। সশস্ত্র সঙ্ঘাতের আইনের আওতায় সক্রিয় যুদ্ধে এমন নেতা বৈধ সামরিক লক্ষ্য হতে পারেন। তিনি সশস্ত্রবাহিনীর অংশ হিসেবে বিবেচিত হোন বা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বেসামরিক হিসেবে ধরা হোক- আইন বিশেষজ্ঞদের এমন মত।

অন্য নেতারাও যখন লক্ষ্যবস্তু : ইরানের বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকা মাহমুদ আহমদিনিজাদও একটি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। বর্তমান তথ্যানুযায়ী, তিনি স্পষ্টতই বেসামরিক ব্যক্তি ছিলেন এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছিলেন না। তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পক্ষে কোনো আইনি যুক্তি দাঁড়াতে পারে, তা পরিষ্কার নয়।

সশস্ত্র সঙ্ঘাত কখন শুরু হলো : যে হামলায় খামেনি নিহত হন, সেটিকেই যুদ্ধের সূচনা হিসেবে ধরা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে- হামলার মুহূর্তে তিনি কি বৈধ সামরিক লক্ষ্য ছিলেন? শান্তিকালে কোনো বিদেশী সামরিক সদস্য বা সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যা করা, যদি তিনি তাৎক্ষণিক সশস্ত্র হামলায় জড়িত না থাকেন, তবে তা খুন হিসেবে গণ্য হবে। যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদিত জাতিসঙ্ঘ সনদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য দেশের ভূখণ্ডে তার সম্মতি ছাড়া বলপ্রয়োগ করতে পারে না, যদি না তা আত্মরক্ষার যুক্তিতে বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে হয়। কার্ডোজো ল স্কুলের অধ্যাপক ও সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা রেবেকা ইনগবার বলেন, ‘যুদ্ধের আইন অনুযায়ী কেউ বৈধ লক্ষ্য হলেও যদি হামলাটিই জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন করে, তবে সেটি অবৈধ। কোনো রাষ্ট্র অবৈধভাবে যুদ্ধ শুরু করে পরে রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করার যৌক্তিকতা দাঁড় করাতে পারে না।’

‘আসন্ন’ হুমকি ছিল কি : আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে হলে জাতিসঙ্ঘের সনদ অনুযায়ী একটি সশস্ত্র হামলা সংঘটিত হওয়া প্রয়োজন। প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইনানুযায়ী, আসন্ন হামলার হুমকির ক্ষেত্রেও আত্মরক্ষামূলক শক্তি প্রয়োগ বৈধ হতে পারে। কিন্তু ‘আসন্ন’ বলতে কী বোঝায়, সেটিই প্রশ্ন। এ হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসন এ যুক্তির দু’টি ভিন্ন ব্যাখ্যার ইঙ্গিত দিয়েছে। একটি ব্যাখ্যায় ‘আসন্ন হুমকি’ শব্দটির খুবই বিস্তৃত ও নমনীয় সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে হয়। অন্যটি আবার কিছুটা ঘুরপথে একই যুক্তিকে নিজেই প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানোর মতো (চক্রাকার যুক্তি) বলে মনে হয়েছে।

গত শনিবার এক ভিডিওতে ট্রাম্প বলেন, লক্ষ্য ছিল ‘ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি দূর করে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা।’ তবে তিনি বলেননি যে ইরান তাৎক্ষণিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বরং তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে দেয়া যাবে না। সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই একটি আসন্ন হুমকি ছিল।’ তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করেছিল ইসরাইল ইরানে হামলা করবে, আর তখন ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রতিরক্ষামূলকভাবে আগে থেকেই’ হামলায় যোগ দেয়।