ওলামায়ে কেরাম সমাজ পরিবর্তনের রূপকার

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে বৃহত্তর আন্দোলন : ডা: শফিক

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদরা জীবন দিয়ে দেশের মানুষকে মুক্ত করে দিয়েছেন। যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েছেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাওয়া যাবে না।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘রক্তাক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও জাতির প্রত্যাশা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। গতকাল বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির উদ্যোগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এখনো পর্যন্ত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানির শামিল। দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা না হলে সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকার এখন একদলীয় শাসনের দিকে হাঁটছে। তারা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া অন্যের বিষয়ে সামান্য পরিমাণও ভ্রƒক্ষেপ করছে না। তারা ফ্যাসিবাদী কায়দায় রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়। ফ্যাসিবাদীদের নিয়ে সরকার ফ্যাসিবাদমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করতে চায়- এটি হাস্যকর। তিনি আররা বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্কা বাস্তবায়ন করতে হলে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে।

নেজামে ইসলাম পার্টির আমির (ভারপ্রাপ্ত) মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সুবহানীর সভাপতিত্বে এবং মহাসচিব মুফতি মূসা বিন ইযহারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল হক চাঁন এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান। আরো বক্তৃতা করেন, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী, নায়েবে আমির মাওলানা মুখলিছুর রহমান কাসেমী, যুগ্ম মহাসচিব ডা: মাওলানা ইলিয়াস খান, সহকারী মহাসচিব হাফেজ মাওলানা আজিজুল হক প্রমুখ।

অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভোটের আগে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখন ক্ষমতায় এসে সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলে চলবে না। ক্ষমতার স্বাদে যদি জনগণের সাথে করা ওয়াদা ভুলে যাওয়া হয়, তাহলে জনগণও এক দিন ভুলে যাবে যে তিনি প্রধানমন্ত্রী।

আল্লামা মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে আবারো নতুন করে বিপ্লবের ডাক দেয়া হবে। শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেয়া হবে না। এক জুলাই রক্ষার প্রয়োজনে আরো হাজার জুলাই সংগঠিত হতে পারে। তাই কোনো ধরনের টালবাহানা না করে দ্রুত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার করতে হবে। সরকার যত দ্রুত সংবিধান সংস্কার করবে- ততই তাদের জন্য মঙ্গল।

জাতীয় ওলামা প্রতিনিধি সম্মেলন : ওলামায়ে কেরামকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান রূপকার হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ওলামায়ে কেরাম শুধু মসজিদে ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত কিংবা খুতবার মধ্যে নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। জাতির ক্রান্তিলগ্নে তাদের সঠিক পথনির্দেশনা, নেতৃত্ব ও আদর্শিক ভূমিকা পালন করতে হবে।

গতকাল রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি ভবনের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ওলামা বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় ওলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।

‘মতবিরোধ নয়, ঐক্যেই গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’ সেøাগানে আয়োজিত এ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় ওলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম। সম্মেলনে প্রস্তাবনা পেশ ও সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় ওলামা বিভাগীয় কমিটির সেক্রেটারি ড. খলিলুর রহমান মাদানী।

বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো বার্তা, কোনো সমাজ পরিবর্তনের, কোনো সভ্যতা পরিবর্তনের সবচেয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারে আলেম-ওলামারা। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, ইসলাম সম্পর্কে যে বিভ্রান্তি সমাজে ছড়ানো হচ্ছে, ফরিজায়ে একামাতে দ্বীনের ব্যাপারে এখনো মানুষের মধ্যে যে ভুল ধারণা আছে, এই সবকিছুর বেড়াজাল ছিন্ন করে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মা’ছুুম বলেন, ছয় মাসের সরকার শুধু ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আলেম সমাজকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশের ওলামায় কেরাম এখন ঐক্যবদ্ধ। আমরা কোনো ফ্যাসিবাদকে ভয় করি না এবং আমাদের যে আদর্শ রয়েছে তা দিয়ে দেশ চালালে কারো কাছে হাত পাতার প্রয়োজন হবে না।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, একদল বলতে বলতে এমন পর্যায়ে গিয়েছে জামায়াতকে মুসলমানই মনে করছে না। তাদেরকে আল্লাহর কাছে ছেড়ে দিয়ে আমাদের কাজ করে যাবো ইনশাআল্লাহ। এ দেশের অধিকাংশ ওলামায় কেরাম একামতের দ্বীন বিজয় করার পক্ষে। বিতর্কিত কোনো আলোচনা আমরা যাবো না। আমাদের বক্তব্যের চূড়ান্ত টার্গেট থাকা উচিত একামতে দ্বীনের আন্দোলনকে বিজয়ী করা। আলেমদের নেতৃত্বে আগামী দিনে একামতে দ্বীনের বিজয় করবো ইনশাআল্লাহ। আকিমুদ্বীনের ঝাণ্ডা নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় কেন্দ্রীয় ওলামা কমিটির সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, আগামী দিনের বাংলাদেশ মতানৈক্য নয় ঐক্যের বাংলাদেশ গড়তে হবে। কেউ কেউ বলে জামায়াতের কাপড় খুলে ফেলবে পাঁচ বছরে, আবার কেউ বলে তাদের জবাই করা উচিত। এদেরকে দেশের মানুষ চিনে ফেলেছে। তাদের কথা মানুষ আর শুনে না। তিনি বলেন, এ দেশের আলেমরা শহীদ হয়েছে। আমাদের জন্য তাদের রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে।

জাতীয় ওলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে ছয়টি প্রস্তাব পেশ করা হয়। প্রস্তাবগুলো হলো-১. মাদরাসা ও কলেজে ইসলামী শিক্ষা সঙ্কোচন বন্ধ করতে হবে। ২. মাদরাসার নারী শিক্ষার্থীদের ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের নির্দেশ প্রত্যাহার করতে হবে। ৩. ওলামা-মাশায়েখদের হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। ৪. প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সঙ্গীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। ৫. ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণ করতে হবে। ৬. ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সার্ভিস রুল ও পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। ৭. ফিলিস্তিন সব জায়গায় মুসলিম হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করতে হবে।

সম্মেলনে আরো বক্তৃতা করেন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ, বাংলাদেশ মজলিসুল মুফাসসিলের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি অধ্যাপক নুরুল আমিন এমপি, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার সাবেক প্রিন্সিপাল অধ্যক্ষ মাওলানা যায়নুল আবেদীন, মাওলানা তারিক মুনাওয়ার, মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, ড. আবদুস সামাদ, ড. আবুল কালাম আজাদ বাশার, লক্ষ্মীপুরের মাওলানা ইসমাইল হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের ওলামা বিভাগের সভাপতি মাওলানা মোশারফ হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের ওলামা বিভাগের সভাপতি ড. মীম আতিকুল্লাহ, উত্তরের সাবেক সভাপতি ড. হাবিবুর রহমান, তানজিমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. হাবীবুল্লাহ মোহাম্মদ ইকবাল প্রমুখ।

জুলাই এখনো শেষ হয় নাই স্থিরচিত্র কূটনীতিকদের পরিদর্শন : বিরোধী দলের মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে গত ৫ আগস্ট থেকে আয়োজিত ‘জুলাই এখনো শেষ হয় নাই’ স্থিরচিত্র পরিদর্শন করেছেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ডেনমার্ক, কানাডা, ইরান, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, জাতিসঙ্ঘের আবাসিক প্রতিনিধি, ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেডক্রস ঢাকার হেড অব ডেলিগেশনসহ ঢাকার কূটনৈতিক মিশনের বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা এ স্থিরচিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন।

পরে এক ব্রিফিংয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেন, প্রদর্শনীতে মূলত কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের ধারাবাহিকতা এবং এর বিরুদ্ধে মানুষের আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। জিয়াউর রহমানকে কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে বিবেচনা না করায় তার ভাষণ বা ভূমিকা প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি।

জামায়াত আমির বলেন, জিয়াউর রহমানকে আমরা স্বৈরাচারী বা কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে বিবেচনা করি না। উনি অটোক্রেট শাসক ছিলেন না। প্রদর্শনীতে যাদের কর্তৃত্ববাদী ও আগ্রাসী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, মূলত তাদেরই তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি মানুষের মুক্তি ও ন্যায্যতার জন্য যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অবদানও প্রদর্শনীর বিভিন্ন অংশে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি।

জামায়াতের এই প্রদর্শনীতে জুলাই আন্দোলনের পটভূমি, বিভিন্ন সময়ে মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং আন্দোলনে হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান ডা: শফিকুর রহমান। প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এটি কোনো সরকারের সাফল্য তুলে ধরার আয়োজন নয়। বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম, নিপীড়নের ইতিহাস এবং শহীদ পরিবারের প্রত্যাশা মানুষের সামনে তুলে ধরাই এই প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. রেজাউল করিমসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরী নেতারা।