সীমান্তে ১১ মাসে ৩২ বাংলাদেশী হত্যা করেছে ভারতীয় বিএসএফ
সীমান্তে বেপরোয়া ভারত
Printed Edition
আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট
- আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য ১১ বছরে ৩৪৫ জনকে হত্যা করেছে বিএসএফ
ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) ও ভারতের সশস্ত্র খাসিয়ারা বেপরোয়া আক্রমণের মাধ্যমে হত্যা করছে বাংলাদেশের সীমান্তের বাসিন্দাদের।
একের পর এক খুনের ঘটনায় রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে সিলেট সীমান্ত। লাশ পড়ছে নিরীহ বাংলাদেশীদের। বিএসএফ এবং তাদের লেলিয়ে দেয়া সশস্ত্র খাসিয়াদের গুলিতে সিলেট বিভাগের সীমান্ত এলাকায় চলতি ২০২৫ সালের ১১ মাসে ১৩ বাংলাদেশী নিহত হন। সর্বশেষ সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তে ভারতীয় সশস্ত্র খাসিয়াদের গুলিতে বাংলাদেশী দুই তরুণ নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের দমদমা সীমান্তে এই জোড়া হত্যাকাণ্ড ঘটে।
নিহতরা হলেন- উপজেলার দমদমা সীমান্তের পূর্ব তুরুং গ্রামের বুরান উদ্দীনের ছেলে আশিকুর (১৯) ও একই গ্রামের মৃত রব মিয়ার ছেলে মোশাঈদ।
বিজিবি ও পুলিশ সূত্র জানায়, দমদমা ১২৬০ মেইন পিলারের ২ নং সাব পিলারের কাছে পরিহাট নামক স্থানে সুপারি আনতে গেলে ভারতীয় খাসিয়ারা গুলি ছোড়ে। এতে আশিকুর ও মোশাহিদ মারা যান।
এদিকে গত ১১ মাসে সমগ্র বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে ভারতীয়দের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩২ বাংলাদেশী।
প্রতি বছরই বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয় বিএসএফ। তবে সেটা শুধু কাগজে কলমে থেকে যায়। কিন্তু হত্যা অব্যাহত থাকে। সর্বশেষ গত ২৫-২৮ আগস্ট রাজধানী ঢাকায় বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৬তম সম্মেলনে সীমান্তে হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির একদিন পর ২৯ আগস্ট সিলেটের কানাইঘাট সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এক বাংলাদেশী। ফলে বিএসএফের প্রতিশ্রুতি কেবল আশ্বাসেই থেকে যায় প্রতিবারই।
২০১৪ সালে সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার বন্ধে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়। কিন্তু তা নিয়মিত উপেক্ষা করছে ভারত। বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিলেট জেলার কানাইঘাট সীমান্তে চারজন, কোম্পানিগঞ্জে দুইজন, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া সীমান্তে তিনজন, হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট সীমান্তে একজন ও সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার ও বিশ্বম্ভরপুর সীমান্তে দিনজন বাংলাদেশী বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছেন।
তথ্য মতে, চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের দশটেকি (নতুন বস্তি) এওলাছড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় আহাদ আলী নামের এক বাংলাদেশী সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। আন্তর্জাতিক সীমানা রেখার পাঁচ গজ ভেতরে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আহাদ আলীকে ভারতীয় নাগরিক হায়দার আলী ও তার সহযোগীরা মিলে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে তার লাশ সীমান্তের ভেতরে ফেলে পালিয়ে যায় ভারতীয় নাগরিকরা।
গত ৩১ মে একই উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে প্রদীপ বৈদ্য (২২) নামের এক বাংলাদেশী তরুণ নিহত হন। নিহত প্রদীপ দত্তগ্রামের বাসিন্দা শৈলেন্দ্র বৈদ্যের ছেলে। কুলাউড়ার দত্তগ্রাম সীমান্তের বিপরীতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য অবস্থিত। পরে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিহতের লাশ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে বিএসএফ।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত আরো তথ্য বলছে, গত ২৯ আগস্ট সিলেটের কানাইঘাটের ডোনা সীমান্তে ভারতীয় অংশে বাংলাদেশী যুবক আব্দুর রহমানকে (৪০) গুলি করে হত্যা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। সীমান্তের ১৩৩৯ নম্বর পিলারের কাছে গুলিতে তিনি মারা যান। নিহত আব্দুর রহমান (৪০) কানাইঘাট উপজেলার আটগ্রাম বড়চাতল (বাকুরি) গ্রামের খলিলুর রহমানের ছেলে। হত্যার পর তার লাশ নিয়ে যায় ভারত। চারদিন পর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আব্দুর রহমানের লাশ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে বিএসএফ।
অপরদিকে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মাছিমপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে সাইদুল ইসলাম (২৩) নামে এক বাংলাদেশী নিহত হন। নিহত সাইদুল ইসলাম উপজেলার গামাইতলা গ্রামের জয়নাল আবেদীনের ছেলে। সাইদুল ইসলাম সীমান্ত এলাকায় নিজের গরু আনতে গেলে নো ম্যানস ল্যান্ডের কাছাকাছি পৌঁছান। তখন বিএসএফ গুলি চালায়। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে সাইদুলকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে তাকে উদ্ধার করে বিশ্বম্ভরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখান থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
গত ১১ জুলাই একই জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বাগানবাড়ি সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে শফিকুল ইসলাম (৪৫) নামে এক বাংলাদেশী নিহত হন। তিনি উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ভাঙ্গাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনিও সীমান্তে গরু আনতে গিয়ে নিহত হন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে।
এদিকে সিলেট বিভাগের আরেক জেলা হবিগঞ্জেও বিএসএফের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন। গত ৬ জানুয়ারি চুনারুঘাট উপজেলার বড় কেয়ারা সীমান্ত এলাকায় জহুর আলী (৫৫) নামের ওই ব্যক্তিকে হত্যা করে বিএসএফ। তিনি চুনারুঘাট উপজেলার পশ্চিম ডুলনা গ্রামের বাসিন্দা। জহুর আলীকে হত্যা করে লাশ বিএসএফ ত্রিপুরা রাজ্যের খোয়াই মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যায়। দুই দিন পর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তার লাশ হস্তান্তর করা হয়। গত ৪ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার মুরইছড়া সীমান্তে সুকিরাম (২৫) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ।
শুধুমাত্র কানাইঘাট উপজেলায়ই ৪ জন নিহত
২৬ অক্টোবর রোববার ভারতীয় খাসিয়ার গুলিতে নিহত হন দনা পাত্তিছড়া গ্রামের আব্দুর রহিম ওরফে সোনাচানের ছেলে শাকিল আহমদ। এর আগে গত ২৯ আগস্ট ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের গুলিতে নিহত হন উপজেলার বড়চাতল পূর্ব গ্রামের মৃত খলিলুর রহমানের ছেলে আব্দুর রহমান। গত ৬ মার্চ বৃহস্পতিবার কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী মঙ্গলপুর আলুবাড়ি এলাকায় শাহেদ আহমদ (২৫) নামের এক বাংলাদেশী যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ ভারতের অভ্যন্তরে পাওয়া যায়। গত ২২ নভেম্বর শনিবার ভারতীয় খাসিয়ার গুলিতে লোভাছড়া সীমান্ত এলাকায় নিহত হন উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের মুলাগুল বাংলাটিলা গ্রামের মৃত মখরম আলীর ছেলে জামাল উদ্দিন (৪৫)।
এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, গত ১১ মাসে বিএসএফের গুলিতে ৩২ বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। গত বুধবার (৩ ডিসেম্বর) ও বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে দু’জনকে গুলি করে হত্যা করে বিএসএফ। সবমিলিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ১১ মাসে সীমান্তে হত্যার সংখ্যা ৩২ জনে দাঁড়াল। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ বছরে নিহত হয়েছেন ৩৪৫ জন। আওয়ামী লীগ আমলেও বছরে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ২০১৪ সালে ৩২ জন, ২০১৫ সালে ৪৬ জন, ২০১৬ সালে ৩১ জন, ২০১৭ সালে ২ জন, ২০১৮ সালে ১৫ জন, ২০১৯ সালে ৪৩ জন, ২০২০ সালে ৪৯ জন, ২০২১ সালে ১৮ জন, ২০২২ সালে ২৩ জন এবং ২০২৪ সালে ৩০ জন নিহত হয়েছেন
সীমান্তে গুলির জন্য অবৈধ অনুপ্রবেশকে যুক্তি হিসেবে দেখাচ্ছে ভারত। তবে বাংলাদেশ বলছে, এই অজুহাতে নিরস্ত্র নাগরিক হত্যা করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে ভারত। সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিশ্রুতিও ভঙ্গ করছে।
বিজিবি বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সীমান্তে তৎপরতা বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তবুও সীমান্তে চোরকারবারি ও মাদক পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য থামছে না। বিজিবি বাংলাদেশী নাগরিকদের সীমান্তের আন্তর্জাতিক শূন্য রেখা মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছে।
বিজিবির কর্মকর্তারা জানান, সীমান্তে কোনো হত্যাই কাম্য নয়। এ ব্যাপারে বিএসএফকে সবসময় কড়া প্রতিবাদ জানায় বিজিবি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত পৃথিবীর একমাত্র সীমান্ত, যেখানে মানুষকে গুলি করে মারা হয়। এটাকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে দিল্লি। অপরাধ হলে কোর্টে সোপর্দ হবে। কোর্ট তাকে শাস্তি দেবে। আমি স্পষ্টভাবেই বলেছি, এটার কোনো সমাধান আমি আপাতত: দেখছি না।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি হত্যার পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের মতো ভারতও উদ্বিগ্ন। তবে ভারতীয় সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মানবপাচার, চোরাকারবার ও অস্ত্র পাচার হয়। এগুলো বন্ধ হলে সীমান্তে হত্যাও বন্ধ হয়ে যাবে। নিজের ভূখণ্ডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে বিএসএফ। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্তের অধিকাংশ ভারতীয় অংশে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া হয়েছে। বাকি অংশে বেড়া দেয়া শেষ হলে সীমান্তে অপরাধ কমবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি মেজর জেনারেল (অব:) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, যদি কোনো চোরাকারবারি বা অন্য কোনো তৎপরতা সেখানে থেকে থাকে, যেকোনো কারণে মানুষকে হত্যা করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের যে একটা বিরূপ ধারণা জন্মায়, তার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে সীমান্ত হত্যা। এর থেকে আমাদের মধ্যে যে ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার কিছু অন্তরায় আছে, তার মধ্যে একটা প্রধান অন্তরায় এটা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারে যারা আছেন তাদের কাছে আমরা বিভিন্ন সময় চিঠি দিয়ে একটা কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড, বিজিবির সিলেট ব্যাটালিয়নের ( ৪৮ বিজিবি) কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হক নয়া দিগন্তকে জানান, সীমান্ত হত্যা অত্যন্ত অমানবিক, আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং অগ্রহণযোগ্য। আমরা বারবার এসব হত্যার প্রতিবাদ জানিয়েছি।
সীমান্তে কোনো বাংলাদেশী অপরাধ করলে তার ব্যাপারে দুই দেশের সীমান্ত আইন অনুযায়ী বিচার হতে পারে। আমরা ভারতীয় কাউকে পেলে তাদের কাছে হস্তান্তর করব। তারা বাংলাদেশী কাউকে পেলে আমাদের কাছে হস্তান্তর করবে। কিন্তু গুলি করে প্রাণে মেরে ফেলার মতো অমানবিক ও লোমহর্ষক কাজ উভয় দেশের সীমান্ত আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। আমরা বারবারই ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছি।