এনসিপি, এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার সমন্বয়ে নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ

Printed Edition
back-2
এনসিপি, এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে জোট গঠন উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

তিনটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ নামে একটি রাজনৈতিক জোটের ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। দল তিনটি হলো- এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্ট) এবং রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে এবং দেশকে পুরনো রাজনীতির পথে যেতে না দেয়ার অঙ্গীকার নিয়ে এই জোটের ঘোষণা দেয়া হয়। গতকাল রোববার বিকেলে রাজধানীর সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম এ ঘোষণা দেন। এ সময় এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম উপস্থিত ছিলেন।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের ভেতরে যে সংস্কার ও পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা জেগে উঠেছিল, সেই আকাক্সক্ষাকে রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিগত দেড় বছরে ঐকমত্য কমিশনের প্রক্রিয়ায় নানা শক্তির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ বিরোধিতা ও বাধার মুখে কাক্সিক্ষত সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। যারা পরিবর্তনের পক্ষে এবং গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্তরিক, সেসব রাজনৈতিক শক্তি এখন এই নতুন জোটের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। জোটের লক্ষ্য কেবল নির্বাচনী সমঝোতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে একটি মর্যাদাবান ও সার্বভৌম রাষ্ট্র নির্মাণ।

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারো বিভাজন সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং সংস্কার ও অর্থনৈতিক মুক্তির মতো জরুরি আলোচনাগুলোকে আড়াল করা হচ্ছে। বিভিন্ন পুরনো রাজনৈতিক দলের দেয়া ‘সিট বণ্টনের লোভনীয় অফার’ তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাম্প্রতিক কিছু সহিংসতা ও বাধার ঘটনাও তুলে ধরেন। এবি পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব ব্যারিস্টার ফুয়াদকে বরিশালে এবং আ স ম আবদুর রবের স্ত্রী তানিয়া রবকে লক্ষ্মীপুরে নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন নাহিদ। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হওয়ার আগেই ভোটকেন্দ্রে আধিপত্য ও দমন-পীড়নের পুরনো সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

তিনি বলেন, গায়ের জোরে বা ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে ভোট আদায়ের চেষ্টা করলে তা ব্যর্থ হবে। দেশের তারুণ্য ও পরিবর্তনের শক্তি গণতন্ত্র ও সংস্কারের পক্ষে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, পুরনো ধাঁচের দলগুলোর সাথে সমঝোতার মাধ্যমে সংস্কার এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা ছিল তাদের অন্যতম ভুল। এবার তারা কেবল সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেই সাথে নিয়ে এগোবেন। একই সাথে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের ভেতরে গণতন্ত্র ও সংস্কারের পথে আসার আহ্বান জানান তিনি।

নাহিদ ইসলামের প্রত্যাশা- গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের ‘নতুন বাংলাদেশ’ ভাবনার সাথে যারা এখনো একাত্ম, তারা সবাই এই জোটের অধীনে ঐক্যবদ্ধভাবে আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবে।

এবি পার্টির সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পর রাষ্ট্রকে যেভাবে কল্পনা করা হয়েছিল, নানা কারণে সেই ভাবনা ও প্রত্যাশা বিপর্যস্ত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মঞ্জু বলেন, নতুন রাজনীতি করতে এসে তারাও নানা আচরণে কষ্ট পেয়েছেন, কখনো দিশাহীন হয়েছেন এবং নতুনদের কর্মকাণ্ড সমালোচিতও হয়েছে। তবে পুরনো রাজনীতির প্রতি জনগণের মোহভঙ্গ ও ক্ষোভ নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। প্রচলিত রাজনীতির বিষোদগার, হামলা, গুম-খুন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস থেকে বেরিয়ে আসতেই নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বহু প্রচেষ্টার পরও পূর্ণ সফলতা না এলেও জুলাই অভ্যুত্থানের অঙ্গীকার ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে দেশের জন্য নতুন রাজনৈতিক দিশা দিতে তিনটি দল হাতে হাত মিলিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। তার মতে, পুরনো রাজনৈতিক ধারা দিয়ে কখনোই পুরনো রাজনীতির ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা সম্ভব হয়নি।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলেন, বাংলাদেশের জন্য আমরা যে মূল্য পরিশোধ করেছি, তা গত ৫০-৫৫ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সেই তুলনায় আমরা যে অর্জনের দিকে এগোচ্ছি, তা আমাদের মানুষের কাছে অনেকটাই হতাশাজনক। আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদেরও মনে হয় যা আমাদের করা উচিত ছিল, যা করার সামর্থ্য ছিল, আমরা তা করতে পারিনি। কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমাদের নেই; আমাদের অবশ্যই সফল হতে হবে। আজ নাহিদ যে ঘোষণা দেবেন, তা মূলত সেই ‘না পারার’ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৬০, ৭০ বা ১০০ বছরের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, যেসব আন্দোলন রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য হয়েছে, সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শক্তিগুলোই পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার প্রশ্নে মুসলিম লীগ, ১৯৫২-এর পর ১৯৫৪-তে যুক্তফ্রন্ট, ১৯৬৯-এর অভ্যুত্থানের পর ১৯৭০-এর নির্বাচনে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে থাকা শক্তি, সবাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জনগণের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে। ১৯৯০-এর গণ-আন্দোলনের পরও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল মনে হলেও আন্দোলনের পক্ষে থাকা শক্তিরাই বিজয়ী হয়েছিল।

হাসনাত বলেন, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলো কেবল ক্ষমতা বদলের নির্বাচন নয়; এগুলো আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, আন্দোলনকে বৈধতা দেয়ার একটি ধাপ। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান টিকবে কি না, সেই অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে যে সংস্কারের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হবে কি না- তার সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ। যারা এই সংস্কারের পক্ষে জীবন দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় রাজনীতিবিদরা সঠিক ভূমিকা পালন করতে পারবেন কি না, সেটিও জনগণ ঠিক করবেন আগামী নির্বাচনে।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি বলেন, আমরা এই আন্দোলনের শক্তিকে বিশ্বাস করি। যারা সংস্কারের আন্দোলন, নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ এবং স্বৈরাচারী কাঠামো ভেঙে ফেলার আকাক্সক্ষা ধারণ করেন- আমরা তাদের নিয়ে কাজ করতে চাই। যদিও আজ আমরা তিনটি সংগঠন নিয়ে যাত্রা শুরু করছি, আমরা মনে করি না যে শুধু এই তিন সংগঠনই সংস্কারের পক্ষে থাকা শক্তি। বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক কর্মী, নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষই এই পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা ধারণ করেন। আমরা বিশ্বাস করি- সেই মানুষগুলো আমাদের সাথে থাকবেন। এই আশাবাদ নিয়ে আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করছি, যাতে শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা যায়। ১৯৭১-এর যে আকাক্সক্ষা ২০২৪ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি, ২০২৪-এর পর সেই আকাক্সক্ষা আমরা বাস্তবায়ন করতে পারব এই বিশ্বাস নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।