রমজানে গেঁটে বাতের রোগীর যতœ

Printed Edition
niramoy-2
রমজানে গেঁটে বাতের রোগীর যতœ

ডা. শাদাব সানী

গেঁটে বাত (গাউট) এক ধরনের বাত। এতে অস্থিসন্ধিতে ব্যথা এবং ফোলা হতে পারে। সাধারণত প্রথমে, এটি শুধু পায়ের বড় আঙুলের একটি জয়েন্টকে আক্রমণ করে। যাদের রক্তে ইউরিক এসিড বেশি থাকে তাদের ক্ষেত্রে এটি ঘটে। ইউরিক এসিড একটি রাসায়নিক, যা শরীর যখন কিছু খাবার ভেঙে দেয় তখন উৎপন্ন হয়। মাত্রাতিরিক্ত ইউরিক এসিড ধারালো সূঁচের মতো স্ফটিক তৈরি করতে পারে যা অস্থিসন্ধিতে জমে প্রদাহ সৃষ্টি করে। ইউরিক এসিড স্ফটিক কিডনির জালিকার (যা কিডনি থেকে মূত্রাশয় পর্যন্ত প্রস্রাব বহন করে) ভেতরেও তৈরি হতে পারে। এই স্ফটিকগুলো কিডনি পাথরে পরিণত হতে পারে যা প্রস্রাবের প্রবাহে ব্যথা এবং সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

গেঁটে বাতের লক্ষণ কী?

গেঁটে বাতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই হঠাৎ করে বুড়ো আঙ্গুল, গোড়ালি বা হাঁটুতে তীব্র ব্যথায় আক্রান্ত হন। অস্থিসন্ধি (জয়েন্ট) লাল হয়ে যায় এবং ফুলে যায়। সাধারণত, শুধু একটি জয়েন্ট আক্রান্ত হয়; কিন্তু কিছু মানুষের একটির বেশি জয়েন্টে ব্যথা হয়। গাউটের আক্রমণ (ফ্লেয়ার) প্রায়শই রাতে ঘটে থাকে।

গেঁটে বাতে থেকে প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে। গেঁটে বাতে আক্রান্ত হওয়ার শুরুতে ব্যথা এবং ফোলার মাত্রা বেশি থাকে। লক্ষণগুলো কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। শরীর কিভাবে একটি গাউট ফ্লেয়ার বন্ধ করে তা স্পষ্ট নয়।

গাউটের কোনো পরীক্ষা আছে কি?

হ্যাঁ, গেঁটে বাত পরীক্ষা করার জন্য, ডাক্তার বা নার্স ব্যথাযুক্ত জয়েন্ট থেকে তরলের নমুনা নিতে পারেন। যদি সে তরলের মধ্যে সাধারণ গাউট স্ফটিক খুঁজে পায়, তাহলে আপনার গেঁটে বাত আছে। এমনকি জয়েন্ট থেকে তরল পরীক্ষা ছাড়াও, উপসর্গ পর্যবেক্ষণ করে আপনার চিকিৎসক দৃঢ়ভাবে গাউট সন্দেহ করতে পারেন যদি-

১. আপনি একটি জয়েন্টে (বিশেষ করে বুড়ো আঙুলের গোড়ায় জয়েন্টে) ব্যথা এবং ফোলা অনুভব করেন।

২. আপনার লক্ষণগুলো দু’টি আক্রমণের (ফ্লেয়ারের) মধ্যে সম্পূর্ণরূপে ভালো হয়ে যায়;

৩. আপনার রক্ত পরীক্ষায় ইউরিক এসিডের উচ্চমাত্রা দেখা যায়।

কীভাবে চিকিৎসা করা হয়?

কয়েকটি ওষুধ আছে যা ব্যথা এবং ফোলা কমাতে সাহায্য করতে পারে। যখন আপনি আপনার উপসর্গ নিরাময়ের জন্য কাজ করে এমন একটি ওষুধ খুঁজে পান, তাহলে এটি সর্বদা হাতের কাছে রাখতে ভুলবেন না। একটি আক্রমণের উপসর্গ শুরু হওয়ার সাথে সাথে আপনি সেগুলো গ্রহণ করলে গাউটের ওষুধগুলো সবচেয়ে ভালো কাজ করে।

গাউট রোধে কি ওষুধ আছে?

হ্যাঁ, এমন কিছু ওষুধ আছে যা ভবিষ্যতে গেঁটে বাতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমাতে পারে। যারা বারবার গাউটের তীব্র ব্যথায় আক্রান্ত হন, তাদের এই ওষুধগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন। সাধারণভাবে এই ওষুধগুলো রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ কমিয়ে আনতে কাজ করে।

আপনি যদি গাউট প্রতিরোধের জন্য ওষুধ গ্রহণ করেন সেক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসক নিশ্চিত করবেন, আপনি এটি নিরাপদে ব্যবহার করছেন এবং তিনি পরীক্ষা করে দেখবেন, আপনার ইউরিক এসিডের মাত্রা গাউট স্ফটিক দ্রবীভূত করার জন্য যথেষ্ট কম। ওষুধ সেবনের শুরুর দিকে গাউটের ব্যথার মাত্রা সাময়িক বৃদ্ধি পেতে পারে। এই ব্যথা রোধ করতেও কোলচিসিন নামের ওষুধটি সেবন করতে হয়। এটি গাউট স্ফটিকগুলোকে দ্রবীভূত করার সময় দেবে এবং এটি সময়ের সাথে সাথে ব্যথা বন্ধ করবে। আপনার যদি গেঁটে বাতে আক্রান্ত হন তবে আপনার দৈনন্দিন ওষুধগুলো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরিক এসিডের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করা

ডাক্তার আপনার ইউরিক এসিডের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করবেন। এটি নিশ্চিত করার জন্য যে ওষুধগুলো কাজ করছে এবং আপনি সঠিক ডোজ গ্রহণ করছেন। গেঁটে বাতের আক্রমণ প্রতিরোধে আমি কি নিজে কিছু করতে পারি?

১. হ্যাঁ, যদি আপনার ওজন বেশি হয়, ওজন কমানো গাউট উপশমে সাহায্য করতে পারে।

এটি স্পষ্ট নয় যে, একটি নির্দিষ্ট খাদ্য পরিকল্পনা অনুসরণ করলে গাউটের উপসর্গগুলো দূর করবে। কিন্তু একটি সুষম খাদ্য খাওয়া আপনার সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে। এটি আপনার ওজন কমাতেও সাহায্য করতে পারে, যদি আপনার ওজন বেশি হয়। পবিত্র রমজান মাসে অতিরিক্ত আহার, পানিশূন্যতা, ঠিকমতো ওষুধ সেবন না করার কারণে ইউরিক এসিডের রোগীর/গেঁটে বাতের রোগীর ফ্লেয়ার হতে পারে। পবিত্র রমজান মাসে গাউট ফ্লেয়ার প্রতিরোধে আমি কি নিজে কিছু করতে পারি?

১. ইফতার বা সাহরির সময় প্রচুর পানি পান করা এবং পানিশূন্য না হওয়ার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

২. ইফতারে ও রাতের খাবারের মেন্যুতে শাকসবজি রাখতে পারেন।

৩. ইফতারে দই/পনির/মাঠা/ লাচ্ছি অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।

৪. পরিহার করুন : অঙ্গের মাংস (গিলা-কলিজা, লিভার, কিডনি), চিনির শরবত, ফলের জুস, চিনি মিষ্টি পানীয়/খাবার বা ফ্রুক্টোজযুক্ত পানীয়।

৫. পরিমিত করুন

সি ফুড/সামুদ্রিক খাদ্য (সার্ডিন, শেলফিশ), রেড মিট/ লাল মাংস (গরুর মাংস, মেষশাবকের মাংস)

পাতে অতিরিক্ত লবণ, প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি ফলের রস।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞ, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ