আসিয়ানের শান্তি আলোচনার মধ্যেই থাই-কম্বোডিয়া সীমান্তে ফের সঙ্ঘাত

Printed Edition
onno-1
কুয়ালালামপুরে বিশেষ আসিয়ান বৈঠকে উপস্থিত নেতারা : ইন্টারনেট

রয়টার্স ও আলজাজিরা

মালয়েশিয়ায় দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যখন থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার প্রাণঘাতী সঙ্ঘাতের সমাধান খুঁজছেন তখন প্রতিবেশী দেশ দু’টির সীমান্ত বরাবার নতুন করে লড়াই শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার স্থানীয় সময় ভোররাতে শুরু হওয়া এ সঙ্ঘাত অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান ন্যাশনস (আসিয়ান) এর যুদ্ধবিরতি চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার কূটনৈতিক উদ্যোগকে দুর্বল করে দিচ্ছে। জুলাইতে মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে ওই যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল।

কিন্তু ৮ ডিসেম্বর থেকে যুদ্ধবিরতি ভেঙে দু’পক্ষ আবার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। তারপর থেকে এ সঙ্ঘাতে উভয়পক্ষের সীমান্ত অঞ্চলে অন্তত ৪০ জন নিহত ও প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সোমবার থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন আর বানতেই মিয়াংচেই প্রদেশে চারটি বোমা ফেলার ও গ্রে চান গ্রামে ‘বিষাক্ত গ্যাস’ ছোড়ার অভিযোগ তুলেছে, জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা আঁজঁস কাম্পুচিয়া প্রেস।

মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছে, কম্বোডিয়ার বাহিনী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা গেছে, বোমা হামলা থেকে বাঁচতে স্থানীয় বাসিন্দারা এক জায়গায় জড়ো হয়েছেন আর তাদের সাথে থাকা শিশুরা কাঁদছে। কম্বোডিয়ার গণমাধ্যমগুলো দেশটির সেনাবাহিনীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, বাটামবাং প্রদেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় ভারী কামান থেকে গোলবর্ষণ করা হয়েছে আর তাতে অন্তত একজন বেসামরিক আহত হয়েছেন।

থাইল্যান্ডের মর্নিং নিউজ টেলিভিশন থ্রি জানায়, সোমবার ভোরে সা কায়েও প্রদেশে ‘গুলি বিনিময়’ হয়েছে, এ সময় কম্বোডিয়ার সেনারা ‘ভারী অস্ত্র’ থেকে গোলা ছুড়েছে। এতে প্রদেশটির খোক সুং জেলায় আগুন ধরে যায় ও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন করে শুরু হওয়া এই লড়াই নিয়ে থাইল্যান্ড সরকার শেষ খবর পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি। সোমবার ভোররাতে কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেতের দপ্তর এক ঘোষণায় জানায়, রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের সীমান্ত অঞ্চলগুলোর প্রায় পাঁচ লাখ ২৫ হাজার বেসামরিক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার ওদোর মিনচে এলাকায় এক বেসামরিক নিহত হয়েছেন। থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের সীমান্ত অঞ্চলগুলোর অন্তত চার লাখ বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, গতকাল সোমবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার প্রতিনিধিরাও অংশ নিচ্ছেন। নতুন করে সঙ্ঘাত শুরু হওয়ার পর এটি তাদের প্রথম সরাসরি বৈঠক। এর আগের দিনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর উভয় পক্ষকে ‘শত্রুতা থামানো, ভারী অস্ত্র প্রত্যাহার, মাইন বসানো বন্ধ ও কুয়ালালামপুর শান্তি চুক্তি পুরোপুরি কার্যকর করার’ আহ্বান জানিয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বৈঠকটি নিয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় উভয় পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করাই তাদের মূল দায়িত্ব। কম্বোডিয়া জানিয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সুপ্রতিবেশী সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠাই তাদের লক্ষ্য। অন্য দিকে থাইল্যান্ড বলেছে, আলোচনার আগে কম্বোডিয়ার পক্ষ থেকে একটি বাস্তব ও টেকসই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা প্রয়োজন। এ দিকে সঙ্ঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনও মধ্যস্থতার চেষ্টা চালাচ্ছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান দৈনিক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, এই মাসে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকে, তারা নিজস্ব উপায়ে এই সঙ্ঘাতের মধ্যস্থতা করে আসছে। তিনি আরো বলেন, বেইজিং যথাসময়ে দেং কর্তৃক পরিচালিত মধ্যস্থতার তথ্য প্রকাশ করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আশা প্রকাশ করেছেন, চলতি সপ্তাহের শুরুতেই নতুন একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি চীন জানিয়েছে, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে তারা গঠনমূলক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে। উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালে আসিয়ান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আসিয়ান সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এই সঙ্ঘাত সবচেয়ে খারাপ। এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থতা ব্লকের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য একটি গুরুতর আঘাত বলে মনে করা হচ্ছে।