এক সপ্তাহ ধরে পরিচালক ছাড়াই চলেছে নিটোর বিশৃঙ্খল প্রশাসন
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহেবিলিটেশনে (নিটোর) বা বহুল পরিচিত পঙ্গু হাসপাতালের প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, সৃষ্টি হয়েছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। গত এক সপ্তাহ ধরে পরিচালকবিহীন অবস্থায় চলেছে দেশের স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি।
স্বাভাবিক চাকরি মেয়াদ শেষ হওয়ায় অধ্যাপক ডা: মো: আবুল কেনান গত এক সপ্তাহ ধরে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন না, তার অবসরকালীন ছুটিতে (্এলপিআর) যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এর পর গতকাল পর্যন্ত নতুন কাউকে পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়নি।
এ দিকে অধ্যাপক ডা: মো: আবুল কেনান গতকাল পর্যন্ত কাউকে দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিলেও নিয়মিত নিটোরে আসছেন বলে জানা গেছে। তবে তিনি পরিচালকের চেয়ারে বসছেন না, অন্য একটি রুমে বসছেন।
পঙ্গু হাসপাতাল এমনিতেই একটি সমস্যা সঙ্কুল হাসপাতাল। এই হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো শেষ নেই। একটি অপরিচ্ছন্ন হাসপাতাল, বাংলাদেশের অন্যান্য সরকারি হাসপাতাল থেকে ব্যতিক্রম কিছু নেই। এখানে দালালদের প্রচণ্ড উৎপাত। রোগীর জন্য এখানে একটি সিট পাওয়া মানে হাতে আসমান পাওয়া। এই সুযোগটিই নিয়ে থাকে এখানকার সঙ্ঘবদ্ধ দালাল চক্র। কোনো প্রশাসনই এই দালাল চক্রের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করতে পারেনি। বাইরের রোগী আসলেই অবাধে দালাল চক্র ফুঁসলিয়ে কাছের প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যায় প্রশাসন ও কতর্ব্যরত পুলিশের সামনেই। নিটোরের কোনো প্রশাসন দালালদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। অধ্যাপক ডা: মো: আবুল কেনানও পারেননি এই দালাল চক্রকে পঙ্গু থেকে বের করে দিতে। ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ এবং আন্তঃবিভাগের সর্বত্রই দালালদের দৌরাত্ম্যে রোগী ও অভিভাবকরা অতিষ্ঠ। শুধু রোগী ভাগানোই নয়, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও পঙ্গুতে না করে বাইরে করতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা।
প্রশাসনিক ব্যাপারে পঙ্গুর চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ অধ্যাপক আবুল কেনানের ব্যর্থতার কারণে তাকে আর চাচ্ছেন না, যদিও তিনি আরো কিছু দিন নিটোরে পরিচালকের পদে থাকতে চান এক্সটেনশন নিয়ে।
পঙ্গুর একাধিক চিকিৎসক নয়া দিগন্তকে বলেন, অধ্যাপক ডা: আবুল কেনান দক্ষতার সাথে হাসপাতালটি পরিচালনা করতে পারেননি। তাকে আরো কিছু দিন এক্সটেনশন দেয়া হলে পরিস্থিতির কোনো উত্তরণ হবে না। পরিচালক পদের জন্য এই হাসপাতালেই একাধিক দক্ষ অধ্যাপক রয়েছেন। তা ছাড়া ডা: কেনান ড্যাবের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হিসাবে নিটোরেও একদলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, একাডেমিক পরিবেশ নষ্ট করে দিয়েছেন। একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং হয় না। এমএস এবং ডিপ্লোমা কোর্সের ডাক্তাররা রাজনৈতিক শক্তির কারণে ক্লাস করেন না। মর্নিং সেশন নিয়মিত হয় না। ডা: আবুল কেনান নিজে কখনোই ক্লাস নেন না। তার একাডেমিক যোগ্যতাও সীমিত। গত বছরের ফেজ-বি এমএস শিক্ষার্থীদের গবেষণার কাজও শুরু হয়নি, নতুন করে ফেজ-বিতে ডাক্তাররা যোগ দিয়েছেন।
সাধারণ চিকিৎসকরা অভিযোগ করেছেন, ডা: আবুল কেনান এমএসআর কেনায় দক্ষ না হওয়ায় এক্স-রে ফিল্ম, প্যাথলজিক্যাল টেস্টের রি-এজেন্ট অপ্রতুল। নিজে কখনো প্রশাসনিক রাউন্ড দেন না। অপারেশন থিয়েটারের (ওটির) এয়ার কন্ডিশন সিস্টেম ঠিক মতো কাজ করে না, দীর্ঘদিন অভিযোগ দেয়া হলেও মেরামতের কোনো ব্যবস্থা নেই। আহত রোগীদের জন্য প্লাস্টার সঙ্কট আছে। সিনিয়র প্রফেসর থাকা সত্ত্বেও, দলীয় বিবেচনায় নতুন সহযোগী অধ্যাপকদের ইউনিট প্রধান বানিয়েছেন। সিনিয়র প্রফেসররা এখনো ইউনিটই পাননি।
সেই সাথে ডা: আবুল কেনান দলীয় ঠিকাদারদের নিয়ে মিটিং করেন। আউটসোর্সিং নিয়োগ নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছেন। প্রশাসনিক অদক্ষতা, একাডেমিক অদক্ষতা, টেন্ডারে অদক্ষতায় হাসপাতাল কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ডা: মো: আবুল কেনানের সাথে গত বুধবার কথা বলতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এসব অভিযোগ কারা করেছে আপনার কাছে? আপনি কাল (বৃহস্পতিবার) আসেন নিটোরে, তখন কথা বলা যাবে। তবে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো কথাও বলেননি, অভিযোগের ব্যাখ্যাও দেননি।