চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটির দায়িত্বে নৌবাহিনীর ড্রাই ডক

সাইফ পাওয়ারটেকের ১৭ বছরের অধ্যায়ের অবসান

শাহ আলম নূর
Printed Edition

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) দায়িত্বে এসেছে নতুন নেতৃত্ব। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বেসরকারি খাতের একটি কোম্পানি দ্বারা পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালটির ব্যবস্থাপনা এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে। নতুন সিদ্ধান্তের আলোকে এনসিটির কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্র বন্দরে অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সরকারি নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অন্তত আগামী ছয় মাস এনসিটির সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে সিডিডিএলের মাধ্যমে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৭ সাল থেকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বে ছিল সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে এতদিন এই টার্মিনাল পরিচালিত হলেও নানা সময় বিভিন্ন অভিযোগ ও অস্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা হয়। এমন পরিস্থিতিতে চুক্তি মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, নতুন করে তাদের দায়িত্ব নবায়নের বিষয়ে সরকার কোনো আগ্রহ দেখায়নি। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার একদিন পর, গতকাল থেকে সরকারিভাবে সিডিডিএল পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। নতুন অপারেটর হিসেবে ড্রাই ডকের একটি প্রস্তুতকৃত টিম ইতোমধ্যে পুরনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিভিন্ন দায়িত্ব বুঝে নেয়ার কাজ শেষ করেছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেড পরবর্তী ছয় মাসের জন্য টার্মিনাল পরিচালনা করবে। এই সময়ের জন্য মন্ত্রণালয় ৪২ কোটি টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দিয়েছে। এই অর্থ ব্যবহৃত হবে টার্মিনালের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং সংশ্লিষ্ট লজিস্টিক প্রয়োজন মেটাতে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব বলছেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এনসিটির দায়িত্ব নৌবাহিনীর মালিকানাধীন সিডিডিএলের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ইতঃমধ্যে তারা কাজ শুরু করেছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে অন্যতম প্রধান অবকাঠামো। এখানে রয়েছে মোট পাঁচটি জেটি। চারটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর জাহাজ এবং একটি অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজের জন্য নির্ধারিত। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর মোট ৩২ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডল করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৮১ হাজার টিইইউস হ্যান্ডলিং হয়েছে কেবল এনসিটি টার্মিনালে। অর্থাৎ বন্দরের মোট কার্যক্রমের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালিত হয়েছে এখান থেকেই। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় এনসিটির গুরুত্ব কতটা ব্যাপক। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দীর্ঘদিন একটি বেসরকারি কোম্পানির হাতে থাকায় অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাইফ পাওয়ারটেক দীর্ঘদিন ধরে এনসিটির কার্যক্রম পরিচালনা করলেও, সময়ের সাথে সাথে নানা ধরনের অভিযোগ উঠে আসে। কর্মীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তোষ, পণ্য খালাসে বিলম্ব, আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি এবং নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতা নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকে। ফলে সরকার নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়। চট্টগ্রাম বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ভবিষ্যতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করছে। জানা গেছে, আগামী নভেম্বরে আন্তর্জাতিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সেটি বাস্তবায়ন হয়, তাহলে ডিপি ওয়ার্ল্ড দীর্ঘমেয়াদে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেতে পারে। তবে সেই চুক্তি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত সিডিডিএলই টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে।

ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের বাণিজ্য প্রবাহ সহজ করতে কাজ করা একটি শীর্ষস্থানীয় লজিস্টিকস কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি ৭৬টি দেশে ৩০০টিরও বেশি ইউনিট পরিচালনা করছে, ছড়িয়ে রয়েছে ছয়টি মহাদেশে। তারা নৌ ও স্থল টার্মিনাল, শিল্পপার্ক এবং প্রযুক্তিনির্ভর সরবরাহ সেবা দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি যেখানেই কার্যক্রম পরিচালনা করুক না কেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করে। সরকার, ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলে প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন চিটাগাং ড্রাই ডক লিমিটেড একটি আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও এর কার্যক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এবং এর আগে দেশের বিভিন্ন মেরিন প্রকল্পে সফলভাবে কাজ করেছে। বন্দর, ড্রেজিং, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাসহ নানামুখী দক্ষতায় সিডিডিএল ইতঃমধ্যেই একটি আস্থা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। বন্দরের মতো একটি কৌশলগত স্থাপনায় এই প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নেয়ায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর কেবল একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি প্রধান স্তম্ভ। তাই এনসিটির মতো টার্মিনাল সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকলে সেখানে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা অনেক বাড়বে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে এনবিআরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা এবং বন্দরের ভেতরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অস্থিরতা সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে আরো উৎসাহিত করেছে। এখন বন্দরের কার্যক্রমে সুশৃঙ্খলতা ও দক্ষতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে নতুন ব্যবস্থাপনা শুরু হলেও, সাইফ পাওয়ারটেক এখন পর্যন্ত এই পরিবর্তন নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। তাদের তরফে কেবল বলা হয়েছে, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তারা সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং পুরনো দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার কাজ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা আভাস দিয়েছেন যে, এতদিন তারা দক্ষতার সাথে টার্মিনাল পরিচালনা করেছেন এবং রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছেন।

এ দিকে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের দায়িত্ব হস্তান্তর কেবল একটি প্রশাসনিক রদবদল নয়, এটি একটি কৌশলগত পালাবদল। একটি বেসরকারি অধ্যায়ের অবসান এবং একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আগমন এই বার্তাই দেয়। সরকার এখন বন্দর ব্যবস্থাপনাকে আরো স্বচ্ছ, নিরাপদ ও কার্যকর করতে চায়। সামনের দিনগুলোতে সিডিডিএল কতটা দক্ষতার সাথে এই টার্মিনাল পরিচালনা করতে পারে, সেটি পর্যবেক্ষণ করা হবে। একই সাথে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে ভবিষ্যৎ চুক্তির দিকেও নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের। তবে আপাতত, বন্দরে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়েছে এবং সবাই চায় এটি যেন হয় উন্নয়ন ও জবাবদিহিতার দৃষ্টান্ত।