নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার আগে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা চায় হামাস

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • স্কুল-কলেজ ধ্বংস, গাজায় সাগর তীরে বসে পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা
  • ইসরাইলের মৃত্যুদণ্ড আইন নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা
  • ধ্বংসস্তূপে ঘর নির্মাণ : গাজায় টিকে থাকার লড়াইয়ে বাসিন্দারা

গাজায় নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতে আলোচনার আগে ইসরাইলি সেনা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা চেয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। মধ্যস্থতাকারীদের কাছে তারা তাদের এ অবস্থান তুলে ধরেছে।

রয়টার্সের বরাতে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ পরিকল্পনার আওতায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি আলোচনায় আনা হলেও সংগঠনটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, গাজা থেকে ইসরাইলের পূর্ণ প্রত্যাহার নিশ্চিত না হলে তারা অস্ত্র ছাড়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা করবে না। সম্প্রতি কায়রোতে মিসর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের সাথে বৈঠকে হামাস প্রতিনিধিদল এ অবস্থান তুলে ধরে। তারা দাবি জানায়, যুদ্ধবিরতির সব শর্ত বাস্তবায়ন, ইসরাইলি হামলা বন্ধ এবং গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের স্পষ্ট রূপরেখা থাকতে হবে। হামাস বলেছে, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। অন্য দিকে, ইসরাইল বলছে, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হলে তারা সেনা প্রত্যাহারে রাজি নয়। সূত্রগুলো বলছে, এই অবস্থানের কারণে দ্রুত কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে হামাস সরাসরি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেনি; বরং তাদের শর্ত পূরণ হলে আলোচনায় অগ্রগতি হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা পুনর্গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য এই আলোচনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক শর্তগুলো সমাধান না হলে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে।

স্কুল-কলেজ ধ্বংস, গাজায় সাগর তীরে বসে পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা

প্রায় আড়াই বছর ধরে গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন চলছে। হামলার মুখে সব ধরনের স্কুল-কলেজের স্থাপনাও ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে এমন পরিস্থিতিতেও গাজার শিক্ষাব্যবস্থা ধসে পড়েনি। তার নজির মিলল এবার, সাগর তীরে বসে পরীক্ষা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। খবর আলজাজিরার। সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গাজার শিক্ষার্থীরা সমুদ্র সৈকতে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে। ইসরাইল গাজার শত শত স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করে দেয়ার পর এই দৃশ্য সবার মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। ভিডিওটির সাথে অনেকে লিখেছেন, ‘গাজার শিক্ষার্থীরা স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হওয়ার পরও সৈকতে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে। কে পারবে এই মানুষগুলোর ইচ্ছাশক্তি ভাঙতে?’ আরেকজন লিখেছেন, ‘হানাদাররা স্কুল ভেঙেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা মেরেছে, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। কিন্তু ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীর মনোবল ভাঙতে পারেনি এবং পারবেও না।’

এই ভিডিওটির ছবি, জায়গা এবং মানুষ- সবই সত্যি। কিন্তু এটি পুরনো। ভিডিওটি আসলে ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গণিত পরীক্ষার সময়ের বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। তবে গাজার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ধ্বংসযজ্ঞের বাস্তবতা মোটেও মিথ্যা নয়। রিপোর্ট বলছে, ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত ২০৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে ১৯০টি স্কুল এবং ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়। আংশিক ক্ষতি হয়েছে আরো ৩০৫টি প্রতিষ্ঠানের। ইসরাইল ১২,৮০০-রও বেশি শিক্ষার্থী এবং ৭৬০ জনেরও বেশি শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীকে হত্যা করেছে। এই যুদ্ধ ৭ লাখ ৮৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত করেছে।

ইসরাইলের মৃত্যুদণ্ড আইন নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনা

ইসরাইলের নতুন মৃত্যুদণ্ড আইনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি বন্দীদের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিধান রাখা হয়েছে, যা বৈষম্যমূলক বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র : টিআরটি ওয়ার্ল্ড।

চীনসহ বিভিন্ন দেশ এ আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছেন, যেকোনো আইনকে ন্যায়বিচার, সমতা ও বৈষম্যহীনতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং এটি ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য করতে পারে না। আইন অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি বন্দীদের ‘সন্ত্রাসবাদ’ অভিযোগে সামরিক আদালতে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে, যেখানে ইসরাইলি নাগরিকদের ক্ষেত্রে ভিন্ন বিচারব্যবস্থা প্রযোজ্য। সমালোচকদের মতে, এতে একটি পৃথক ও কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা মানবাধিকারের পরিপন্থী। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই আইন কার্যকর হলে অনেক ফিলিস্তিনি বন্দী মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা চালালেও তাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের শাস্তির বিধান নেই। বিশ্লেষকদের মতে, এই আইন শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, বরং অঞ্চলটির উত্তেজনাও আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।

ধ্বংসস্তূপে ঘর নির্মাণ : গাজায় টিকে থাকার লড়াইয়ে বাসিন্দারা

গাজায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতায় নিজেদের মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করতে ধ্বংসস্তূপই এখন ভরসা হয়ে উঠেছে অনেক পরিবারের। গাজা সিটির তুফাহ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আল-জাদবা তার ধ্বংস হওয়া বাড়ির ইট-পাথর, কাদা- এমনকি মানুষের চুল ব্যবহার করে নতুন করে একটি ছোট ঘর নির্মাণের চেষ্টা করছেন। ৩১ বছর বয়সী মোহাম্মদের চারতলা বাড়িটি যুদ্ধের সময় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধবিরতির পর থেকে তিনি ১০ সদস্যের পরিবার নিয়ে ধ্বংসস্তূপের পাশেই তাঁবুতে বসবাস করছিলেন। শীত ও বৃষ্টিতে চরম দুর্ভোগের পর তিনি স্থায়ী আশ্রয়ের চেষ্টা শুরু করেন। নির্মাণ সামগ্রীর অভাবে তিনি কাদা ও ধ্বংসাবশেষ ব্যবহার করছেন। খড়ের অভাব পূরণে তিনি নাপিতের দোকান থেকে সংগ্রহ করা চুল মিশিয়ে দেয়াল তৈরি করেছেন, যা আশাতীতভাবে মজবুত হয়েছে। তবে এটি যে স্থায়ী সমাধান নয়, তা নিজেও জানেন তিনি। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৯২ শতাংশ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে এবং পূর্ণ পুনর্গঠনে প্রয়োজন প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় এখনো বড় আকারে পুনর্গঠন শুরু হয়নি। অন্যদিকে, খান ইউনুসের আবদেল নাসের আল-জালুসি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে ফিরে এলেও দরজা-জানালার পরিবর্তে ত্রিপল ব্যবহার করে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, ‘এটি কোনো পুনর্গঠন নয়, বরং অস্থায়ী জোড়াতালি।’

বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় পুনর্গঠন এখনো দূরস্বপ্নই রয়ে গেছে। ফলে হাজার হাজার পরিবার ধ্বংসস্তূপ ও অস্থায়ী আশ্রয়ে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

পূর্ব গাজায় গোলাবর্ষণ ও ভবন ধ্বংস

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পূর্ব গাজায় আবারো গোলাবর্ষণ ও ভবন ধ্বংসের ঘটনা ঘটিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। বুধবার বিভিন্ন এলাকায় ভারী গোলাবর্ষণ, গুলিবর্ষণ ও সামরিক অভিযান চালানো হয় বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত পূর্বাঞ্চলগুলোতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হামলার তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দিনভর এবং রাত পর্যন্ত গোলাবর্ষণ চলার পাশাপাশি ‘ইয়েলো লাইন’ সংলগ্ন এলাকায় সামরিক যানবাহনের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে তিনটি ভবন ধ্বংসের পাশাপাশি বানি সুহেইলা, শেখ নাসের ও তাহলিয়া এলাকায়ও গোলাবর্ষণ করা হয়। একই ধরনের হামলা চালানো হয় দেইর আল-বালাহ, বুরেইজ শরণার্থী শিবির এবং উত্তর গাজার তুফাহ, জেইতুন, শুজাইয়া ও জাবালিয়া এলাকায়। এ ছাড়া গাজা উপকূলে বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতেও নৌবাহিনী থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৭১৩ জন নিহত এবং ১৯৪০ জন আহত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হামলা চলতে থাকলে গাজায় মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হতে পারে।