হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে : সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী
৩০০ শিশু মারা গেল, স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের কথা ভাবলেন না কেন : ড. মাসুদ
Printed Edition
সংসদ প্রতিবেদক
হামের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ, শিশু মৃত্যুহার কমানো, হাসপাতাল সেবার ডিজিটাল রূপান্তর এবং স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ও দালালচক্র নির্মূলে বহুমুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে সরকার। একই সাথে সরকারি-বেসরকারি ১০৫টি মেডিকেল কলেজে ১১ হাজার ৩৭৮ শিক্ষার্থীর ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি এবং ৮৭টি সরকারি হাসপাতালে সমন্বিত অটোমেশন ব্যবস্থা চালুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো: সাখাওয়াত হোসেন এ তথ্য জানান।
সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তারের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো সব শিশুকে টিকার আওতায় এনে শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। হামের প্রাদুর্ভাব মোকবেলায় সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তবে টিকাদানে অনীহা, অসম্পূর্ণ টিকাদান, জনসচেতনতার অভাব এবং ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে রোগটির বিস্তার ঘটে। তিনি বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব বা এ-সংক্রান্ত মৃত্যুর ঘটনায় দায় নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবহেলা বা দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়।
মন্ত্রী জানান, ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে। টিকা সংগ্রহ পদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কিনা, তা কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজন হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো জানান, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, মজুত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, রোগ নজরদারি সম্প্রসারণ, দ্রুত প্রাদুর্ভাব শনাক্তকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সাথে সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার আওতায় আনতে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
সংরক্ষিত মহিলা আসন-১৭-এর সদস্য সুলতানা আহমেদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের ৮৭টি সরকারি হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত হাসপাতাল অটোমেশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৬১টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১৪টি জেলা হাসপাতাল, দু’টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ১০টি জাতীয় পর্যায়ের হাসপাতাল। এই ব্যবস্থার আওতায় ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, ফার্মেসির ওষুধ বিতরণ ও ট্র্যাকিং, সেবামূল্য আদায় এবং রেফারেল সেবা ডিজিটালভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, রোগীর চিকিৎসা তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকায় একই পরীক্ষা বা নথিপত্র বারবার করার প্রয়োজন হচ্ছে না। ফলে চিকিৎসা ব্যয় কমছে এবং রোগীর সম্মতির ভিত্তিতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে তথ্য স্থানান্তরও সম্ভব হচ্ছে। তিনি জানান, বর্তমানে ১৫টি হাসপাতালে ই-টিকিটিং সেবা চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে রোগীরা ঘরে বসেই টিকিট সংগ্রহ করে সরাসরি চিকিৎসকের সেবা নিতে পারছেন। পর্যায়ক্রমে দেশের সব হাসপাতালে এ সেবা সম্প্রসারণ করা হবে।
মন্ত্রী আরো বলেন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা সারাদেশে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পর্যালোচনাধীন রয়েছে। পাশাপাশি পাঁচটি জেলায় ইউনিক হেলথ আইডি, ই-হেলথ কার্ড এবং সমন্বিত অটোমেশন সেবা চালুর জন্য একটি পাইলট প্রকল্পও প্রস্তুত করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ-৮ আসনের সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৩৭টি সরকারি ও ৬৮টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি সরকারি ও পাঁচটি বেসরকারি এবং নৌবাহিনী পরিচালিত একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে আসন সংখ্যা পাঁচ হাজার ১০০ এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ছয় হাজার ২৭৮। সবমিলিয়ে দেশের ১০৫টি মেডিকেল কলেজে মোট ১১ হাজার ৩৭৮ শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যখাতকে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরে ডিজিটালাইজেশন জোরদার করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের পাশাপাশি টেলিমেডিসিন সেবার পরিধি সম্প্রসারণ করা হয়েছে, যাতে রোগীরা সহজে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।
‘৩০০ শিশু মারা গেল, স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের কথা ভাবলেন না কেন?’
এ দিকে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. মো: শফিকুল ইসলাম মাসুদ। জামায়াত দলীয় এই সংসদ সদস্য বলেন, ছয়জন শিশু মারা যাওয়ার অজুহাতে লাইসেন্স বাতিল করা হলো। অথচ দেশে যখন হামে ৩০০ শিশু মারা গেল, তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগের কথা ভাবলেন না কেন?
প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ৭০০ শয্যার একটি হাসপাতালের ১৮০টি বেড বিনামূল্যে পরিচালিত হচ্ছে, প্রতিদিন সেখানে ২৩টি স্বাভাবিক প্রসব করানো হয় এবং রোগী ও তাদের স্বজনদের বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করা হয়।
অথচ মাত্র ছয়টি শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে প্রায় ৩০০ শিশুর মৃত্যু হলেও তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রশ্ন ওঠেনি কেন। স্বাস্থ্য খাতের বড় ধরনের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা না থাকলেও একটি হাসপাতালের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদ সদস্য আরো বলেন, লাইসেন্স বাতিলের ফলে ওই প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট ২৪৭ জন বিদেশী শিক্ষার্থী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। তারা স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিংবা স্বাস্থ্য সচিবের সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।