বিদ্যুতের চাহিদা ও লোডশেডিং তথ্যে অস্বচ্ছতা, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

Printed Edition

আশরাফুল ইসলাম

দেশের বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। একদিকে জ্বালানি সঙ্কট, অন্য দিকে উৎপাদন ঘাটতি সব মিলিয়ে লোডশেডিং এখন দৈনন্দিন বাস্তবতা। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা ও ঘাটতির তথ্য নিয়ে অস্বচ্ছতা। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতি আড়াল করতে বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা প্রকাশ করা হচ্ছে না। ফলে লোডশেডিংয়ের প্রকৃত চিত্রও সামনে আসছে না।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিগত বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের একই সময়ে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। অথচ বর্তমান সময়ে সরকারি হিসাব অনুযায়ী চাহিদা তুলনামূলক কম দেখানো হচ্ছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত চাহিদা গোপন রাখার মাধ্যমে লোডশেডিংয়ের প্রকৃত পরিমাণ আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে গড়ে ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। অথচ গরমের মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। সেই হিসেবে চাহিদা ১৮ হাজার থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াট হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। যদি এই হিসাব ধরা হয়, তাহলে উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে অন্তত ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন ব্যাপক লোডশেডিং হচ্ছে, যার পুরোটা সরকারি হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।

এই ঘাটতির মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা জ্বালানি সঙ্কটকে দায়ী করছেন। বর্তমানে দেশের বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানি অভাবে বন্ধ বা আংশিক সক্ষমতায় চলছে। বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না। একই সাথে এলএনজি আমদানি ব্যয়বহুল হওয়ায় তা সীমিত আকারে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

অন্য দিকে, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব কেন্দ্র চালানো ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। ফলে সরকার অনেক ক্ষেত্রেই এসব কেন্দ্র বন্ধ রাখছে বা সীমিতভাবে চালাচ্ছে। এতে করে উৎপাদন আরো কমে যাচ্ছে এবং লোডশেডিং বাড়ছে।

লোডশেডিংয়ের এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ। শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি সময় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক এলাকায় দিনে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এতে করে কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ না থাকায় কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

শিল্প খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের রফতানির প্রধান খাত, সেটিও ক্ষতির মুখে পড়ছে। অনেক কারখানাকে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

এদিকে, বিদ্যুতের চাহিদা কম দেখানোর ফলে নীতিনির্ধারণেও ভুল বার্তা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদি প্রকৃত চাহিদা ও ঘাটতি স্বীকার করা না হয়, তাহলে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব আরো ভয়াবহ হতে পারে।

বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ক্যাপাসিটি চার্জ। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন না করলেও তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এতে করে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। অথচ সেই কেন্দ্রগুলো থেকে বাস্তবে কোনো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একদিকে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্য দিকে লোডশেডিং কমছে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন স্বচ্ছতা। বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা ও উৎপাদনের তথ্য জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। এতে করে সমস্যার বাস্তব চিত্র বোঝা সহজ হবে এবং সমাধানের পথও সুগম হবে। একই সাথে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপচয় রোধ করাও জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে সিস্টেম লস ও অব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি বড় অংশ সাশ্রয় করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সঙ্কট শুধুমাত্র উৎপাদন ঘাটতির সমস্যা নয়, বরং এটি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতার অভাবের একটি সম্মিলিত ফল। লোডশেডিং নিয়ে লুকোচুরি বন্ধ করে বাস্তব পরিস্থিতি স্বীকার করাই হতে পারে এই সঙ্কট সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ। অন্যথায় সামনে গ্রীষ্ম মৌসুমে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, যার খেসারত দিতে হবে সাধারণ জনগণ ও দেশের অর্থনীতিকে।