যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের জাহাজ জব্দ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন : বিশ্ব শিপিং সংস্থা
অবিলম্বে আটক জাহাজগুলোর নাবিকদের মুক্তি দাবি
Printed Edition
আলজাজিরা
বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার এবং একে অপরের জাহাজ জব্দের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিং’ (আইসিএস)। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংস্থাটি অবিলম্বে আটক নাবিকদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছে।
আলজাজিরাকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আইসিএসের মেরিন ডিরেক্টর জন স্টপার্ট বলেন, সমুদ্রপথে নাবিকদের কোনো প্রকার নিগ্রহ বা ভয়ভীতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে চলাচল করতে দেয়া উচিত। উল্লেখ্য, আইসিএস বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ মালিক ও পরিচালনাকারীদের প্রতিনিধিত্ব করে। স্টপার্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নৌ-চলাচলের যে স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি তার ওপর এক চরম আঘাত।
বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কেবল পণ্য পরিবহনের কাজ করে, সেখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাধারণ নাবিকদের বন্দী বা জাহাজ জব্দ করার মতো ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি মূলত নিরপরাধ মানুষকে কারারুদ্ধ করার নামান্তর, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ইরান সম্প্রতি হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর টোল বা মাশুল আদায়ের যে ইচ্ছা পোষণ করেছে, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই বলেও উল্লেখ করেন স্টপার্ট। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের পদক্ষেপ একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে। আজ যদি হরমুজ প্রণালীতে টোল আদায় করা হয়, তবে ভবিষ্যতে জিব্রাল্টার বা মালাক্কা প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোতেও একই ধরনের অনাকাক্সিক্ষত দাবি ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্য দিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ জারির কঠোর সমালোচনা করেছে শিপিং সংস্থাটি। তাদের মতে, একদিকে ইরানের পদক্ষেপের কারণে প্রণালীটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, আর অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ নৌ-পরিবহন কোম্পানিগুলোর জন্য চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইরান ঠিক কোন মানদণ্ডে বা কেন জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, সে বিষয়ে যেমন স্বচ্ছতা নেই, তেমনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর একই ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই দু’টি করে মোট চারটি বাণিজ্যিক জাহাজ জব্দ করার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা ভারত মহাসাগর থেকে ইরান-সংশ্লিষ্ট ‘ম্যাজেস্টিক এক্স’ নামক একটি জাহাজ জব্দ করেছে, যা মূলত নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল পরিবহন করছিল। এর কয়েকদিন আগে তারা ‘টিফানি’ নামক আরো একটি জাহাজ আটক করে।
এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের ইসলামিক রেভুলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পানামার পতাকাবাহী ‘এমএসসি ফ্রান্সেস্কা’ এবং গ্রিসের মালিকানাধীন ‘এপামিনন্ডাস’ নামক জাহাজ দু’টিকে জব্দ করেছে। তেহরানের দাবি, জাহাজ দু’টি প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র ছাড়াই চলাচল করছিল এবং তাদের নেভিগেশন সিস্টেমে কারচুপি করা হয়েছে। এই উত্তেজনার মাঝে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ নাবিকরা।
ফিলিপাইনের অভিবাসী শ্রমিক বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে, ইরানি বাহিনীর হাতে আটক দু’টি জাহাজে ১৫ জন ফিলিপিনো নাবিক রয়েছেন। যদিও ইরান দাবি করেছে তারা সুরক্ষিত আছেন, কিন্তু আইসিএস মনে করে কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাদের আটকে রাখাটাই মূল উদ্বেগের বিষয়। এ ছাড়া মন্টেনেগ্রোর চারজন নাবিকও ইরানি হেফাজতে রয়েছেন। অন্য দিকে, মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক নাবিকদের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে স্টপার্ট জানান, হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ২০ হাজার নাবিক পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছেন। দীর্ঘ সাত সপ্তাহ ধরে তারা এক প্রকার ‘গৃহবন্দী’ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এখন আন্তর্জাতিক মহলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইসিএস যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষকে অবিলম্বে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়ার এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।