জুলাইয়ের প্রথম নারী শহীদ নাঈমা

হাবিবুল বাশার
Printed Edition

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ প্রথম নারী নাঈমা সুলতানা। চব্বিশের ১৯ জুলাই বিকেলে রাজধানীর উত্তরার নিজ বাসার বারান্দায় শুকাতে দেয়া কাপড় আনতে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণীর এই শিক্ষার্থী। পরিবারের দাবি, দুই বছর পরও সেই মৃত্যুর বিচার না হওয়ায় শোকের সাথে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছে তার পরিবার।

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার সুলতানাবাদ ইউনিয়নের আমুয়াকান্দা গ্রামের মেয়ে নাঈমা সুলতানার জন্ম ২০০৯ সালের ২৫ জুলাই। তিনি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন। পড়াশোনায় মেধাবী নাঈমার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করা। বাবা গোলাম মোস্তাফা, যিনি পেশায় একজন হোমিও চিকিৎসক, মেয়েকে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নই দেখতেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৯ জুলাই বিকেলে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসায় অবস্থান করছিলেন নাঈমা। বাইরে গুলির শব্দের মধ্যে বারান্দায় শুকাতে দেয়া কাপড় আনতে গেলে হঠাৎ একটি গুলি তার মাথায় এসে লাগে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি বারান্দায় লুটিয়ে পড়েন।

নাঈমার মা আইনুন নাহার বলেন, মেয়ের মাথায় গুলি লাগার পর মুহূর্তেই বারান্দাজুড়ে রক্ত ছড়িয়ে পড়ে। আকস্মিক সেই ঘটনায় তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন। তার চিৎকার শুনে নিচে থাকা শিক্ষার্থী ও প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। পাশের বাসার একজন প্রতিবেশী প্রথমে নাঈমাকে কোলে তুলে নিচে নামান। পরে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে দ্রুত উত্তরা আধুনিক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার পর নাঈমাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) নেয়া হয়। পরিবার তখনও আশা করেছিল, হয়তো চিকিৎসায় মেয়েকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। কিন্তু মাথায় গুরুতর গুলিবিদ্ধ হওয়ায় চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

মা বলেন, হাসপাতাল থেকেই নাঈমার বাবাকে খবর দেয়া হয়। হৃদরোগে আক্রান্ত বাবা গোলাম মোস্তাফা মেয়ের মাথায় গুলি লাগার খবর শুনেই আশঙ্কা করেছিলেন, হয়তো আর তাকে জীবিত ফিরে পাওয়া যাবে না।

মৃত্যুর পরও পরিবারের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। তখন ঢাকাজুড়ে কারফিউ ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা চলছিল। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, লাশ গ্রামের বাড়িতে নিতে কোনো অ্যাম্বুলেন্স সহজে রাজি হচ্ছিল না। পরে অতিরিক্ত অর্থ ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাসে একটি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়। নাঈমার এক চাচা স্ট্রোক রোগীর কাগজপত্র নিয়ে রোগীর ছদ্মবেশে অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে পৌঁছান। পরে রাতেই লাশ নিয়ে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয় পরিবার। পথে একাধিক তল্লাশি চৌকি অতিক্রম করতে হয়। পরিবার জানায়, প্রতিটি জায়গায় তারা বলেছেন, নাঈমা কোনো মিছিলে অংশ নিতে যাননি; নিজ বাসার বারান্দাতেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরদিন ২০ জুলাই চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার আমুয়াকান্দা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও নাঈমার মৃত্যুর বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে পরিবার। তাদের অভিযোগ, নিরস্ত্র অবস্থায় নিজ বাসায় থাকা এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় এখনো প্রত্যাশিত বিচার নিশ্চিত হয়নি।

নাঈমার মা আইনুন নাহার বলেন, আমার মেয়ে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। কিন্তু আমি চাই, আমার মেয়ের হত্যার বিচার হোক। যারা এই ঘটনার জন্য দায়ী, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। আর কোনো মা যেন আমার মতো সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য না হন।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, নাঈমাসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত প্রতিটি নিরীহ মানুষের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাদের প্রত্যাশা, বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো নিরীহ মানুষ নিজের ঘরেও প্রাণ হারানোর শিকার না হন।