মাদুরোকে তুলে নিলো যুক্তরাষ্ট্র

Printed Edition
first 1
মাদুরোকে তুলে নিলো যুক্তরাষ্ট্র

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ভেনিজুয়েলায় মার্কিন বিমান হামলা

  • দেশটিকে পরিচালনার দম্ভ প্রকাশ ট্রাম্পের লাতিন আমেরিকায় নতুন সঙ্কট

আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের তোয়াক্কা না করে একতরফা সিদ্ধান্তে ভেনিজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। আবার এ আগ্রাসী ঘটনাকে ‘গ্রেফতার’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় ব্যাপক বিমান হামলার পর বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। শনিবার ভোরে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা যাওয়ার পর ট্রাম্পের কথিত ‘সফল’ অভিযানের ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। পরে ফ্লোরিডায় সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প অভিযানের বিস্তারিত জানানোর পাশাপাশি নিজের পছন্দের পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত ভেনিজুয়েলা পরিচালনার দম্ভ প্রকাশ করেন। এ ছাড়া সোশ্যাল প্লাটফর্মে যুক্তরাষ্ট্র অভিমুখী যুদ্ধজাহাজে বন্দী মাদুরোর ছবিও প্রকাশ করেন তিনি।

এর আগে বিমান হামলার কারণে কারাকাসের লা কার্লোটা বিমানবন্দর এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। ভেনিজুয়েলা সরকার দাবি করেছে, মার্কিন বাহিনী একযোগে বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ঘটনার পরপরই দেশটিতে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।

ভেনিজুয়েলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্র : ট্রাম্প

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা ক্ষমতার ‘নিরাপদ, যথাযথ ও সুবিচারপূর্ণ পরিবর্তন না করতে পারা পর্যন্ত’ ভেনিজুয়েলা ‘পরিচালনা করবে’ যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের স্থানীয় সময় সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসব কথা জানান।

নিজের মার-এ-লাগো স্টেইটে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভেনিজুয়েলার ‘অংশীদারিত্ব’ দেশটির জনগণকে ‘ধনী, স্বনির্ভর ও নিরাপদ’ করবে। তিনি আরো বলেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা ভেনিজুয়েলানরা ‘অত্যন্ত সন্তুষ্ট’ হবে।

ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার মাদুরোকে ‘অবৈধ স্বৈরশাসক’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে এর আগে ওয়াশিংটনের এ অভিযোগ মাদুরো তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন; জানিয়েছে বিবিসি।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজে বন্দী মাদুরোর ছবি প্রকাশ : এর আগে ট্রুথ স্যোশাল প্লাটফর্মে একটি ছবি শেয়ার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইউএসএস ইয়ু জিমা নিকোলাস মাদুরো’। ইউএসএস ইয়ু জিমা এমকি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ। এর আগে ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখ করেছিলেন, এই জাহাজে করেই মাদুরোকে নিয়ে আসা হচ্ছে।

ওই ছবিতে নিকোলাস মাদুরোকে দেখা যাচ্ছে, যার চোখে কালো মাস্ক দিয়ে ঢাকা, কানে হেডফোন রয়েছে এবং হাতে হ্যান্ডকাফ। তিনি ধূসর রঙের একটি ট্রাকস্যুট বা দৌড়ানোর পোশাক পরে রয়েছেন।

ট্রাম্পের ঘোষণা ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান : অভিযানের পরপরই একে চমৎকার অভিহিত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘বড় পরিসরের অভিযানের মাধ্যমে নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে দেশ থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।’ যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসকে দেয়া সংক্ষিপ্ত টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, দক্ষ ও দুর্দান্ত সব মানুষ এই অসাধারণ পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন। তিনি আরো বলেন, আসলে এটি ছিল একটি চমৎকার অভিযান।

তবে এই অভিযানের জন্য মার্কিন কংগ্রেসের কোনো অনুমতি নেয়া হয়েছিল কি না কিংবা ভেনিজুয়েলার পরবর্তী রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবেÑ সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি ট্রাম্প।

এ দিকে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানিয়েছেন, নিউ ইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে মাদুরো ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, নার্কো-টেরোরিজম ষড়যন্ত্র, কোকেন পাচার, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের মালিকানা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র ষড়যন্ত্র। বন্ডি বলেন, “তারা এখন আমেরিকার মাটিতে আমেরিকার আদালতে বিচারের মুখোমুখি হবে।”

এ দিকে রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি দাবি করেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাকে জানিয়েছেন যে মাদুরো বর্তমানে মার্কিন হেফাজতে রয়েছেন এবং আপাতত ভেনিজুয়েলায় আর সামরিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা নেই।

মাদুরো জীবিত থাকার প্রমাণ চান ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট

ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক অডিও বার্তায় বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রী কোথায় আছেন, সরকার তা জানে না। আমরা তাদের জীবিত থাকার প্রমাণ চাই।’ এ ছাড়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভøাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ বলেন, বিদেশী সেনাদের উপস্থিতি ভেনিজুয়েলা প্রতিহত করবে এবং বেসামরিক হতাহতের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এ দিকে নাগরিকদের শান্ত থাকার এবং দেশের নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ভেনিজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো ক্যাবেলো। তাকে উদ্ধৃত করে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স বলেছে, “এই আক্রমণ সম্পর্কে বিশ্বের কথা বলা উচিত।”

প্রতিক্রিয়া : ইউরোপ ও যুক্তরাজ্য: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে যুক্তরাজ্য জড়িত নয়। তবে এই হামলার বিষয়ে মন্তব্য করার আগে তিনি এ বিষয়ে আরো তথ্য জানতে চান।

বিবিসির খবরে বলা হয়, স্টারমার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার বিষয়ে তিনি এখনো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে কথা বলেননি।

যুক্তরাজ্যের সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর জন্য রেকর্ড করা বক্তব্যে স্টারসার বলেন, বিষয়টি (হামলা পরিস্থিতি) খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই সব তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমি এটুকু বলতে পারি যে, এই অভিযানে যুক্তরাজ্য কোনোভাবেই সম্পৃক্ত ছিল না।’

আর ইইউর পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কালাস বলেন, মাদুরোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসঙ্ঘ সনদ মানা অপরিহার্য।

পরিস্থিতি ‘দ্রুত স্পষ্ট’ করার আহ্বান রাশিয়ার : ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি ‘দ্রুত স্পষ্ট’ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়েছেÑ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর রাশিয়া ওই আহ্বান জানাল।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী অভিযানের সময় ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে সে দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে-এটি অত্যন্ত উদ্বেগের। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘আমরা এই পরিস্থিতি দ্রুত স্পষ্ট করার আহ্বান জানাই।’ রাশিয়া জানিয়েছে, এই ধরনের পদক্ষেপ সত্য হলে, তা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অগ্রহণযোগ্য লঙ্ঘন।

লাতিন আমেরিকা ও মিত্র রাষ্ট্রগুলো : কিউবা একে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে উদ্বেগ এবং নিন্দা জানিয়েছেন চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিক। হামলার ঘটনায় জাতিসঙ্ঘকে “অবিলম্বে বৈঠক” করার আহ্বান জানিয়েছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুতাভো পেত্রো। ভেনিজুয়েলা সীমান্তে বাহিনী মোতায়েনের খবরও জানিয়েছেন তিনি। কিউবার প্রেসেডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল বলেছেন, তার দেশ “ভেনিজুয়েলার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধমূলক আক্রমণের নিন্দা জানায় এবং জরুরি ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া আশা করে।” ইরান একে ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। স্পেন ও ইতালি উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও নতুন নজির

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে গ্রেফতার করা আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক ভয়ঙ্কর নজির।

কাতারের হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুলতান বারাকাত বলেন, এটি কার্যত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের কফিনে শেষ পেরেক। এখন অন্য শক্তিগুলোও একই যুক্তি ব্যবহার করতে পারে।

চ্যাথাম হাউজের গবেষক ক্রিস্টোফার সাবাতিনি বলেন, ছয় মাসের সামরিক চাপেও ভেনিজুয়েলায় অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ তৈরি না হওয়ায় এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, কিন্তু এর ফল হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা।

ভেনিজুয়েলার সাংবাদিক সিসি দে ফ্লাভিস বলেন,“মাদুরোর পতন মানেই দ্রুত গণতন্ত্র নয়। দেশ পুনর্গঠনে লাগবে বহু বছর, এমনকি দশক।”

দীর্ঘ মার্কিন হস্তক্ষেপের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : ভেনিজুয়েলায় হামলা লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ হস্তক্ষেপমূলক ইতিহাসকে আবার সামনে এনেছে। গুয়াতেমালা (১৯৫৪), কিউবা (১৯৬১), চিলি (১৯৭৩), পানামা (১৯৮৯) থেকে শুরু করে একাধিক দেশে সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনার নজির রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘মাদুরো গ্রেফতার’ দাবি সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইতি নয় বরং তা হবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আইন ব্যবস্থায় এক বিপজ্জনক মোড়। এই ঘটনা লাতিন আমেরিকা, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবেÑ এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়।

কয়েক দিন আগে মাদুরোকে আটকের অনুমোদন : প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক দিন আগে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অনুমোদন দিয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স এই অভিযান চালাবেÑ সেই অনুমোদনও দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল একজন ব্যক্তি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এ কথা জানিয়েছেন।

মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মামলা আছে : ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দুর্নীতি, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করা হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব মামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর ঘোষণা দিয়েছিল মাদুরোকে গ্রেফতার বা দোষী সাব্যস্ত করতে সহায়ক তথ্য দিলে পাঁচ কোটি ডলার পুরস্কার দেয়া হবে।