জোট সদস্য দেশকে বহিষ্কারের কোনো বিধান নেই : ন্যাটো

পেন্টাগনের গোপন ই-মেইলে ইরান যুদ্ধে সহায়তা না দেয়া দেশগুলোকে ‘শাস্তি’ দেয়ার প্রস্তাব

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরান যুদ্ধ নিয়ে মতভেদের জেরে স্পেনকে সামরিক জোট ন্যাটো থেকে স্থগিত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হুমকির প্রেক্ষাপটে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। তবে ন্যাটো কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, জোটের কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে স্থগিত বা বহিষ্কার করার কোনো আইনি বিধান তাদের সংবিধানে নেই। সম্প্রতি রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ই-মেইলে ইরান যুদ্ধে পর্যাপ্ত সহায়তা না দেয়া মিত্র দেশগুলোকে ‘শাস্তি’ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ওই ই-মেইলে বিশেষ করে স্পেনের সদস্যপদ স্থগিত করার বিষয়টি উঠে আসে। তবে ন্যাটোর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা চুক্তিতে সদস্যপদ বাতিল বা স্থগিতের বিষয়ে কোনো ধরনের রূপরেখা দেয়া হয়নি। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও এই প্রতিবেদনকে গুরুত্বহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিবিসি

পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি কিংসলি উইলসন এই পরিস্থিতির বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করলেও প্রয়োজনের সময় অনেককেই পাশে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি মিত্র দেশগুলোকে ‘কাগুজে বাঘ’ হিসেবে অভিহিত না করে নিজেদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তবে অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে আসছেন। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ সচল রাখার বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর অনীহায় ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন। স্পেন তাদের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন বিমান ঘাঁটিগুলোকে ইরানের ওপর হামলার জন্য ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সানচেজ স্পষ্ট করেছেন যে, স্পেন আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই মিত্রদের সহযোগিতা করতে আগ্রহী।

এ দিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ইরান যুদ্ধে ব্রিটেনের গভীরতর সম্পৃক্ততা বা মার্কিন অবরোধে অংশগ্রহণের বিষয়টি দেশের স্বার্থবিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন। তবে ব্রিটেন মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে এবং ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার অভিযানে অংশ নিয়েছে। পেন্টাগনের ওই বিতর্কিত ই-মেইলে আরো একটি চাঞ্চল্যকর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে; সেখানে বলা হয়েছে যে, যেসব মিত্র সহযোগিতা করছে না, তাদের বিরোধপূর্ণ অঞ্চলগুলোর ওপর থেকে মার্কিন কূটনৈতিক সমর্থন প্রত্যাহার করা হতে পারে। এর মধ্যে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের দাবির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে আর্জেন্টিনার পক্ষ নেয়ার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইউরোপীয় মিত্রদের সরাসরি আক্রমণ করে বলেছেন, তারা কেবল ‘ফাঁকা বুলি’ না আওড়িয়ে নিজেদের সুরক্ষার জন্য নিজেদেরই নৌকা বা যুদ্ধজাহাজ নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। তার মতে, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই সঙ্কটের মুখে ন্যাটোর ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন এবং ইউরোপীয় স্তম্ভকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্য দিকে জার্মানিও স্পেনের সদস্যপদ নিয়ে কোনো সংশয় নেই বলে কড়া বার্তা দিয়েছে। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের দীর্ঘদিনের সামরিক মিত্রতার ফাটল এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।