ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির ১৮৫ বছর : ঢাকা কলেজে মাঠের ‘গণ-ইফতার’

Printed Edition
back-2
ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির ১৮৫ বছর : ঢাকা কলেজে মাঠের ‘গণ-ইফতার’

হাবিবুল বাশার

উপমহাদেশের উচ্চশিক্ষার আলোকবর্তিকা এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজ তার ১৮৫ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারা অব্যাহত রেখেছে। ১৮৪১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ অবধি প্রতিষ্ঠানটি কেবল জ্ঞানচর্চায় নয়, বরং বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

১৮ জুলাই ১৮৪১ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের উদ্যোগে ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কার্যক্রম চললেও ১৮৪৬ সালে এটি সদরঘাটের নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে ধানমন্ডির মিরপুর রোডে বর্তমান ক্যাম্পাসে কলেজটি স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পায়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ঢাকা কলেজের অবদান অবিস্মরণীয়; কলেজের দক্ষ শিক্ষক ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরি নিয়েই তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা শুরু হয়েছিল।

সম্প্রীতি অনন্য অধ্যায়

ঢাকা কলেজের ইফতার সংস্কৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ। বর্তমানে কলেজের বিশাল খেলার মাঠ বা ‘সবুজ গালিচায়’ বিভিন্ন আদর্শের ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সহাবস্থান এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

শিক্ষার্থীরা বলেন, এই মাঠে ছাত্রদল, ছাত্রশক্তি, ছাত্রশিবির ও ছাত্র আন্দোলনসহ কলেজের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্লাবগুলো নির্দিষ্ট পরিবেশে মাঠের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে একই সময়ে ইফতার আয়োজন করে।

প্রতিটি সংগঠন বা গ্রুপ নিজেদের ইফতারের খরচ নিজেরা বহন করলেও, একই মাঠে সবার এই শান্তিপূর্ণ অবস্থান ঢাকা কলেজের এক বৈচিত্র্যপূর্ণ অধ্যায়।

ইফতার সংস্কৃতির এই মানবিক দিকটি নিয়ে ঢাকা কলেজ সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: ফয়সাল আহমেদ বলেন, কলেজের খেলার মাঠে দল, মত কিংবা পরিচয়ের ভেদাভেদ ভুলে শিক্ষার্থীরা একসাথে বসে ইফতার করেন। এই দৃশ্য শুধু ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রতিদিন বিকেলের দিকে মাঠ ভরে ওঠে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে। কেউ বন্ধুদের সাথে, কেউ সিনিয়র-জুনিয়র মিলে, আবার কেউ নতুন পরিচয়ের বন্ধুত্ব গড়ে তুলে একসাথে ইফতার করেন।

এতে যেমন ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ে, তেমনি ক্যাম্পাসে তৈরি হয় একটি ইতিবাচক ও মানবিক পরিবেশ। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও সেই প্রভাব পড়েনি শিক্ষার্থীদের ওপর। ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজের এই দৃশ্য যেন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকে এবং আমাদের ক্যাম্পাসকে আরো বেশি সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করবে এই প্রত্যাশাই করি।

ঘরোয়া আমেজে ইফতার মেনু

ঢাকা কলেজের ইফতার আয়োজনে আভিজাত্যের চেয়ে আন্তরিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। বর্তমান সময়ের নিয়মিত ইফতার মেনুতে থাকে-

ভাজাভুজি : মচমচে পেঁয়াজু, বেগুনি ও আলুর চপ।

ফলমূল ও মিষ্টান্ন : সুমিষ্ট খেজুর এবং সতেজ আপেল।

পানীয় : ক্লান্তি দূর করতে ঠাণ্ডা শরবত।

১৯ শতকের শেষ দিকে ছাত্রাবাসের ডাইনিং থেকে শুরু হওয়া সাধারণ এক আয়োজন আজ ঢাকা কলেজের এক বিশাল ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। একদিকে পড়াশোনার শ্রেষ্ঠত্ব, অন্য দিকে মাঠের সবুজ ঘাসে বসে শত শত শিক্ষার্থীর একসাথে ইফতার সব মিলিয়ে ঢাকা কলেজ আজও তার আভিজাত্য, সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে।